বৃহস্পতিবার, ২৩ জুন, ২০১১

হারিয়ে যেতে এসেছি

আমাদের গ্রামের মাধবদা ঘুড়ি বানাতেন। অনেকেই বানাতেন; কিন্তু মাধবদার ঘুড়ি আকারে এবং প্রকারে এতই বিচিত্র ছিল যে লোকেরা তাঁকে কেবল ওই ঘুড়ির জন্যই চিনত। ছেলেমেয়েদের কাছে তিনি ছিলেন রীতিমতো এক স্বপ্নের নায়ক। 
মাধবদার ঘুড়ি উড়ত বিকেলবেলায়। শীতের শেষ শেষ, উত্তরের খোলায় গিয়ে বিশাল ঘুড়িটাকে কয়েকজন মিলে আকাশে উড়িয়ে দিত। ছেলেমেয়েগুলো বিপুল বিস্ময়ে চেয়ে থাকত ঘুড়ির দিকে। সেই ঘুড়িকে আমরা বলতাম ‘দুয়োরি’, কেন জানি না। তাতে আবার ‘ডাক’ বাঁধা থাকত। মানে ঘুড়ির ওপরের দিকে পাতলা একটা বেতের বা অন্য কিছুর টুকরো বেধে দিতেন মাধবদা। তাতে বাতাস বেধে প্রচণ্ড শব্দ হতো। 
সন্ধ্যা হলেও ঘুড়ি নামাতেন না মাধবদা। রাতে পড়ার বইয়ের সামনে ঢুলতে ঢুলতে সব পাড়ার ‘বালক-বালিকারা’ শুনতে পেত হু হু করা ঘুড়ির ডাক। বইয়ের পাতা থেকে চোখ দুটো কোথায় যেন হারিয়ে যেত। ঘুড়িটা এখন কত ওপরে? কী দেখছে অত ওপর থেকে, যে এমন করে কাঁদছে?
মাধবদা এখন কোমরের ব্যথায় বিছানা থেকে উঠতে পারেন না। আমাদের গ্রামে কেউ আর অমন ঘুড়ি বানায় না। তাই আমাদের গ্রামের ছেলেমেয়েরাও আর রাতের বেলায় হারিয়ে যায় না সুদূর কোন অন্ধকার আকাশে।
ধরেই নেওয়া হয়, এখন যুগটা ‘না হারানোর’ যুগ। ছেলেমেয়েগুলো যদি পড়ার টেবিলে বসে হারিয়েই যায়; তো ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হবে কী করে! কী করে লড়বে এই ‘ফার্স্ট হতেই হবে’ লড়াইয়ে। এখন পরিকল্পনা করা হয়, আর যা-ই হোক হারিয়ে যাওয়া চলবে না।
ছেলেমেয়েগুলোকে এই হারাতে না দেওয়ার জন্য কত্ত পরিকল্পনা! ছেলেমেয়েগুলো বাসা থেকে বেরিয়ে যেন ঠিক ঠিক ইস্কুলেই পৌছোয়; সে জন্য সঙ্গে সান্ত্রী সেজে ছোটেন মা-বাবা। তা না পারলে ড্রাইভার আঙ্কেল তো রইলেনই। 
চোখে চোখে রাখতে হয়, শুধু যেন স্কুল আর পড়াশোনা এবং মাপা কথা শেখা হয়। স্কুল ফাকি দিয়ে রাস্তায় এসে জীবানুযুক্ত খাবার খাওয়া চলবে না, দুপুর রোদে ত্বক নষ্ট হতে দেওয়া চলবে না, বিকেল বেলায় পাশের এক চিলতে মাঠে গায়ে ধুলো মাখানো চলবে না। মোদ্দা কথা, হারানো চলবে না। 
এই যে ‘চলবে না, চলবে না’ স্লোগান সেটা কী শুধু ছেলেমেয়েগুলোর জন্য? আমাদের বুড়োদের জন্যও তো চারিদিকে ওই স্লোগানÑহারানো চলবে না। হারানোর জায়গাটা কোথায়। সেই বাসা, চেনা রাস্তা, বাসি চায়ের দোকান আর অফিস। আবার অফিস, চায়ের দোকান, চেনা রাস্তা আর বাসা। এই চক্রে পড়ে হারানোর চিন্তা করাও বন্ধ। 
চক্রের বাইরে দু পা ফেলে একটু বেরোলেই সঙ্গে ল্যাপটপ; ইন্টারনেটে হাজির সেই চেনা জগতের বন্ধন। আমাদের ছোট্ট গ্রামটাতে গিয়েও এখন আর হারানোর উপায় নেই। সেখানে মাধবদার ঘুড়ির ডাক শোনার উপায় নেই। বরং চারিদিকে ডিজিটাল সাউন্ড। আর সর্বব্যাপী এক মোবাইলের রিংটোন!
‘দেশ বিস্তৃত নেটওয়ার্ক’-এর যন্ত্রনায় একমুহুর্তের জন্য হারানোর উপায় নেই। মিনিটে মিনিটে চেনা-অচেনা কণ্ঠ ভেসে আসে, ‘হ্যালো...’। 
তাহলে হারাতে পারবই না!
অনেক পথ ঘুরে হারানোর জন্য ব্লগে এলাম। এখানে কেউ আমাকে চেনে না। আমি কাউকে চিনি না। এখানে আমাকে কোনো কেতা মানার দিব্যি কেউ দিয়ে দেয়নি। এখানে আমি নাকি শুধুই হারাতে পারব। 
হারানোর জন্য এলাম আপনাদের কাছে। 

সোশ্যাল নেটওয়ার্ক

Twitter Delicious Facebook Digg Stumbleupon Favorites