একটি ট্রেন লাইনের মৃত্যু

আমাদের একটা ট্রেন ছিল। অনেক দিন আগেই সে মারা গেছে; মেরে ফেলা হয়েছে! এই সেদিন পত্রিকান্তরে জানা গেল, শেষকৃত্য হয়ে গেছে আমাদের সেই ছোট্ট, শান্ত ট্রেনলাইনটার। হবে না কেন? আর কত কাল এই বোঝা বইবে সরকার? শেষ পর্যন্ত নিলামটিলাম করে কাদের যেন দায়িত্ব দিয়ে দেওয়া হয়েছিল, রূপসা-বাগেরহাট রেললাইনটা খুঁচিয়ে তুলে ফেলার।

একজন সিদ্দিকুর এবং যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস

তারিখটা মনে নেই। রেডিসন হোটেলের ঘটনা। মঞ্চে বসে আছেন তিন বাহিনীর প্রধান। তাদের পাশে একটু সংকুচিত হয়ে বসে আছেন কালো একটি ছেলে; ছেলেটির মুখ থেকে দীপ্তি ঠিকরে বের হচ্ছে। সেনাপ্রধান বক্তৃতা দিতে উঠলেন। দর্শকসারিতে চেয়ে বললেন, ‘এখানে কি সিদ্দিকের মা আছেন?’

কোচ সমাচার

‘কোচ দুই ধরনের। এক দল বরখাস্ত হয়েছে। আরেক দল বরখাস্ত হওয়ার অপেক্ষায় আছে।’ কথাটা নিশ্চয়ই এর মধ্যে কয়েক হাজার বার শুনে ফেলেছেন। শুনুন বা না-ই শুনুন, কোথাও কোনো কোচ বরখাস্ত হলে পত্রিকায় তো পড়েছেন নিশ্চয়ই? কিন্তু কোচরা এমন ঘন ঘন ছাঁটাই হন কেন?

প্রফেসর ইউনুস ও দুর্নীতি এবং আমাদের ভাবমূর্তি

শেখ হাসিনা মধ্যবিত্ত ঝগড়াটে মহিলার মতো আচরণ করে ইউনুস সাহেবের সত্যিকারের কোনো ক্ষতি করতে পারেননি। আর্থিক ও জনপ্রিয়তার বিচারে ইউনুস সাহেবের লাভই হয়েছে।

এক খামখেয়ালি বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন

তিনি বেস্টের মতো খামখেয়ালি, মোৎজার্টের মতো শিল্পী, হিটলারের মতো ইহুদিবিদ্বেষী-নারীবিদ্বেষী এবং আলীর মতো চ্যাম্পিয়ন। তিনি রবার্ট জেমস ফিশার বা ববি ফিশার, দাবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন! নিয়মতান্ত্রিক এই দুনিয়ার প্রতি অনিয়মের এক প্রবল পরিহাস।

ব্লগ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ব্লগ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বুধবার, ২০ জুলাই, ২০১১

বাবাকে মনে পড়ে

বাবা ঠিক আমাদের চেনা-জানা জগতের মানুষ ছিলেন না।
আমাদের জগতের মানুষগুলোর মতো স্ত্রী-সন্তান-পরিবার-আত্মীয়স্বজন-অর্থ-ভবিষ্যত নিয়ে বাবা কখনো চিন্তিত ছিলেন না।
বাবা কখনো আমাদের পড়তে বসতে বলেননি। বাবা কখনো আমাদের জন্য হাতে করে একটু খাবার বা খেলনা নিয়ে বাড়ি ফিরতেন না। বাবা কখনো বলতেন না, তোরা তো বখে যাচ্ছিস!
বাবা সরকারী চাকরি করতেন; বেশ বড় চাকরি।
গল্প শুনেছি, বাবা নাকি আমাদের তিন ভাইয়ের নাম জানতেন না। জীবনের বিরল কীর্তি হিসেবে বাড়িতে একবার চিঠি লিখেছিলেন। সেখানে আমাদের লিখেছিলেন: শিব, নারায়ন আর কার্তিক কেমন আছে? উদ্দেশ্য আমাদের তিন ভাইয়ের খবর নেওয়া।
কিন্তু সত্যিটা হল, আমাদের নাম কোনোকালেই শিব-নারায়ন-কার্তিক ছিল না। ধরেই নেওয়া যায়, বাবা আমাদের নাম মনে রাখতে পারতেন না।
বাবার সঙ্গে ছোটবেলায় আমাদের দেখা-সাক্ষাতই খুব একটা হয়ে উঠতো না। দেবহাটা, কলারোয়া, পাটকেলঘাটা, আশাশুনি....আরও কোথায় কোথায় যেন চাকরি করে বেড়াতেন। ফলে ছোটবেলায় বাবাকে দেখায় খুব একটা হয়ে উঠতো না।
বৃহষ্পতিবার গভীর রাতে বাবা বাড়ি ফিরতেন; শুক্রবার সকালে উঠে আবিস্কার করতাম আমরা। সে আবিস্কারে বিরাট কোনো ফূর্তি ছিল না; কোনো ভয়ও ছিল না। কারণ, বাবা কোনো আমোদ নিয়ে আসতেন না। কারণ, বাবা শাসন করতেন না।
বাবা এসে বাগানে চলে যেতেন। একটা দা আর একটা রেডিও। দা দিয়ে কুট কুট করে সারাটা দিন বাগান পরিস্কার করতেন। পাশে বেজে চলতো বিজ্ঞাপন-তরঙ্গ অথবা ইডেনের ক্রিকেট ম্যাচ।
ক্রিকেটের বড় পাগল ছিলেন। জাগতিক এই একটা ব্যাপারই বাবাকে টানত।
বাবার সঙ্গে আমাদের নিয়মিত দেখা হওয়া শুরু হল অবসরে যাওয়ার ক দিন আগে থেকে। বাগেরহাটে নিজেদের জেলায় পোস্টিং পেয়ে অবসরে গিয়েছিলেন। তখন বাড়ি থেকে অষিপ করতেন।
তখন আমরা একটু বড় হয়েছি। বাবাকে এড়িয়ে চলতাম। বাবা তাতে কিছু মনে করতেন না। কাছে নিয়ে আহলাদ করতে না পারলে কষ্ট পাবেন, এমন মানুষ তো ছিলেন না।
অবসরের পরে সার্বক্ষনিক সঙ্গী হয়ে গেল ওই বাগান, সবজি খেত আর রেডিও। কিসব আজব আজব সবজি চাষ করতেন। কখনো চীনা বাদাম, কখনো তরমুজ, কখনো পেস্তা বাদাম!
মিথ্যাচার না করলে বলতে হয়, বাবার এসব বিচিত্র চাষের ফলন বেশিরভাগ সময়ই হতাশাজনক ছিল। তাতে বাবার উৎসাহের কমতি ছিল না। একটা বাদামের চারার পেছনে দিনটা ব্যায় করে দিতেন। সব উৎসাহ ওই চাষে আর গাভাস্কারের ব্যাটিংয়ে।
আমাদের নিয়ে একদমই উৎসাহ ছিল না। আমি তখন সিগারেট ধরেছি। কে একজন এসে নালিশ করলো, ‘তোমার ছলডা তো বিড়ি খায়।’
আমি ঘরে ঘুমের ভান করে শুয়ে শুনছি; বাবা বললেন, ‘বড় হইছে, এখন তো আর আমি নিষেধ করতে পারি না। আমিও তো নস্যি টানি; ওরা কি নিষেধ করে!’
এই আমার বাবা।
তখন বাবার সঙ্গী আমার চাচাতো ভাইটা: তন্ময়। রাতদিন ওই চাষাবাদ করতে করতে তন্ময়ের সঙ্গে বিচিত্র সব গল্প বলতেন। সুনীল গাভাস্কারের সঙ্গে তার কি কথা হল ‍কিংবা ভিভ রিচার্ডস বাবার কাছে কি জানতে চাইলেন: এসব গল্প তন্ময় হয়ে শুনতো তন্ময়।
আমরা বড় হয়ে গেছি। তখন এসব গল্প শোনার মন কই!
বাবার সঙ্গে দূরত্বটা আরও বেড়ে গেল। আমি ‘মানুষ’ হওয়ার আশায় ঢাকায় চলে এলাম। প্রথম আলোতে চাকরি করছি। হঠাৎ শুনলাম, বাবার ক্যান্সার। বাবাকে ঢাকায় নিয়ে আসা হল।
নিউরোসার্জন দাদার কল্যানে চিকিৎসা বিষয়ক ব্যয় বা চিন্তা কোনোটাই আমাকে করতে হল না। শুধু রাতে পালা করে তিন ভাই থাকতাম বাবার কাছে; পিজি হাসপাতালে। থাকতে হয় বলে থাকতাম। বাবার সঙ্গে তো খাতির ছিল না।
আমি জানতাম, বাবাও আমার খোজখবর রাখেন না। আমিও রাখি না।
একদিন বাবা আমার দুনিয়াটা কাঁপিয়ে দিলেন। গভীর রাতে ফিরেছি হাসপাতালে। আমাকে দেখে মেজদা চলে গেল দাদার বাসায়। বাবা ঘুম; আমার তাই মনে হয়েছিল।
আমি চুপি চুপি পাশের বেডে ঘুমাতে যাচ্ছি; বাবার কণ্ঠ পেলাম, ‘কাবার্ডের মধ্যে একটা বক্সে পায়েস রাখা আছে। খেয়ে নিও। বড় বৌ (আমার বৌদি) এনেছে।’
আমি বললাম, ‘আপনি খাননি কেন?’
বাবা একটু ইতস্তত করে বললেন, ‘না। তুমি পায়েসটা ভালো খাও তো। তাই রেখে দিলাম।’
আমার চেনা বাবার জগতটা মিথ্যে হয়ে গেল।
আমি পায়েস ভালো খাই সবাই জানে। আমার মা জানে সবার চেয়ে বেশি। আমার বন্ধুরা জানে, আত্মীয়স্বজন জানে। কিন্তু বাবার তো জানার কথা না। তিনি তো আমার নামই মনে রাখতে পারেন না!
বাবা কি করে জানলেন আমার পায়েস ভালো খাওয়ার কথা?
প্রশ্নটা করা হয়নি। ভেবেছিলাম, একদিন চুপি চুপি জিজ্ঞেস করবো। তার আগে বাবার কাকুতিতে তাকে বাড়ি নিয়ে যাওয়া হল।
একদিন ভোর রাতে ফোন এলো, বোড়ি যেতে হবে। বুঝলাম, বাবা নেই। শেষ বেলায় নাকি আমার নাম করে ডাকছিলেন।
বাবা আমার নাম জানতেন! বাবা আমার পছন্দ জানতেন!
অথচ আমার বাবাকে জানা হল না। বাবাকে প্রশ্নটা করা হল না।
রহস্যটা রেখে চলে গেলেন বাবা।

[একই বিষয় নিয়ে কাছাকাছি গদ্যে বাবা দিবসে প্রথম আলোয় একটি লেখা লিখেছিলাম। সেই লেখার কোনো কপি আমার কাছে নেই।]

শনিবার, ১৬ জুলাই, ২০১১

চোখের জল শুকিয়ে গেছে


১৯৯০ সাল থেকে বিশ্বকাপ দেখি। বুঝে দেখি না, দেখি আর কী।
তখন ভালো ফুটবল, মন্দ ফুটবল; কিচ্ছু বুঝতাম না। হা করে গোল দেখতাম। ফলে আর্জেন্টিনা কি ফুটবল খেলে ফাইনালে উঠেছিল, ফাইনালে কেমন ফুটবল খেলেছিল মনে নেই। শুধু মনে আছে একজন মানুষের কান্না।
খুব কাছে পেয়ে দ্বিতীয়বারের মতো ট্রফি ছোয়া হল না বলে একজন মহামানবের কান্নার কথা মনে আছে।
মনে আছে একা একা একটা দলকে ফাইনালে তুলে এনে বিচারকের পক্ষপাতের কাছে সব হারানোর একজন মানুষ হাউ মাউ করে কাঁদছেন। সেই আসলে আমার আর্জেন্টিনা বিষয়ক প্রথম শক্ত কোনো স্মৃতি। আর্জেন্টিনাকে আমি প্রথম ভালো করে চিনেছিলাম সেই মানুষটি, সেই ডিয়েগো ম্যারাডোনার কান্নার ভেতর দিয়ে।
কেন যেন কিছু না বুঝেই সেদিন ওই মানুষটির সঙ্গে তাল মিলিয়ে কেদেছিলাম।
তারপর থেকে আর্জেন্টিনার জন্য কান্না অভ্যেসে পরিণত হয়ে গেছে। তারপর থেকে সবসময় আমি আর্জেন্টিনার জন্য কাঁদি। আর এই লাতিন দেশটির ফুটবলারগুলোও এমন নিষ্ঠুর, সবাইকে কাদানোতেই যেন ওদের সবচেয়ে বড় শান্তি।
সেদিনের পর থেকে একটিবারও আর্জেন্টিনার হয়ে হাসার সুযোগ করে দেয়নি ওরা। আর্জেন্টিনার সুন্দর ফুটবল দেখে গর্ব করতে পেরেছি, আর্জেন্টিনার গোল উৎসব দেখে আনন্দে নেচে উঠতে পেরেছি, আর্জেন্টাইন কোনো খেলোয়াড়ের জাদু দেখে বুকটা ভরে গেছে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত কাঁদতেই হয়েছে।
এর মধ্যে ১৯৯৩ সালে বাতিস্তুতারা একবার কোপা জিতেছিলেন। বলতে লজ্জা নেই, মফস্বলের ছেলে, তখন কোপা-টোপা বোঝার উপায় ছিল না। তখন ফুটবল মানে বিশ্বকাপ। আর বিশ্বকাপ মানে কান্না। ১৯৯৪ সালে ম্যারাডোনা কাঁদিয়েছেন, ১৯৯৮ সালে ওর্তেগা। ২০০২ সালে আর্জেন্টিনার ‘সর্বকালের সেরা দল’ প্রথম রাউন্ড থেকে মাথা নিচু করে বিদায় নিল; আমরা কাঁদলাম।
২০০৪ সালের কোপায় স্যাভিওলাদের দেখলাম ফাইনালে ব্রাজিলের সঙ্গে সমানে সমান টক্কর দিয়ে ২-২ গোলে ড্র করতে। আবার কাঁদতে হল পেনাল্টি শুটআউটে। দু বছর পর, ২০০৬ বিশ্বকাপে মনটাই ভরে গেল।
জার্মানিতে কী ফুটবলটাই না খেললো আর্জেন্টিনা! রিকেলমে, তেভেজ, রদ্রিগেজ, ক্যাম্বিয়াসো; সঙ্গে পিচ্চি একটা ছেলে লিওনেল মেসি। পুরো বিশ্বকাপটা চরকির মতো নিজেদের পায়ে নাচাচ্ছিল ওরা।
লাভ নেই। সেই কোয়ার্টার ফাইনালে এসে জার্মানির বিপক্ষে আবার কান্না। ২০০৭ সালে ভাবলাম বুঝি কান্নার শেষ হল। এবার কোপাটা অন্তত কেউ নিতে পারবে না। ব্রাজিল খোড়াতে খোড়াতে ফাইনালে উঠল। আর তুঙ্গফর্মের রিকেলমে ও মেসির কাছে ফাইনালের পথে সব দল স্রেফ উড়ে গেল।
ফাইনালে কি হল? ৩-০; ব্রাজিলের পক্ষে রেজাল্ট!
২০১০ বিশ্বকাপের আগে ভেবেছিলাম, এবার আর কান্না-টান্না লাগবে না। কোচ ম্যারাডোনা যেমন লেজে গোবরে করে ফেলেছেন, তাতে দল প্রথম পর্বই পার হতে পারবে না। কিন্তু ওই যে বললাম, ওদের মধ্যে একটা নিষ্ঠুরতা আছে। সেই নিষ্ঠুরতা প্রকাশের আগে কোত্থেকে যেন অমানুষিক একটা সৌন্দর্য এসে ভর করে আর্জেন্টাইনদের ওপর।
সেই সৌন্দর্যের জালে আবার বাধা পড়লাম। মেসি একটাও গোল পেলেন না; কিন্তু কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত বিশ্বকাপের সেরা আকর্ষন হয়ে রইলেন মেসি, সেরা দল আর্জেন্টিনা, সবচেয়ে আকর্ষনীয় কোচ ম্যারাডোনা!
তাদের পরিণতি আর মনে করিয়ে দেব!
আর কাঁদতে ইচ্ছে করে না। এবার কোপায় ভেবেছিলাম একই কথা। যে নোংরা ফুটবল প্রথম দু ম্যাচে খেললো, তাতে এদের জন্য চোখের জল ফেলা যায় না। কিন্তু কষ্ট তো দিতেই হবে। তাই কোস্টারিকার বিপক্ষে জাদু ভর করল। আমরা আর্জেন্টাইনদের নিষ্ঠুরতার কথা ভুলে গিয়ে আবার আশায় বুক বাঁধলাম।
মাঝ রাতে উঠে চোখে জল দিয়ে আবার স্বপ্ন দেখেতে বসলাম। পিছিয়ে পড়ল দুর্দান্ত খেলতে থাকা আর্জেন্টিনা। মেসির পাস থেকে হিগুয়েইন সমতা ফেরালেন। আর গোল হয় না। হিগুয়েইনের আচমকা শট বিস্ময়কর ভাবে ফেরায় উরুগুয়ের কিশোর গোলরক্ষক, মেসি শেষ মুহুর্তে ফিনিশ করতে ভুলে যান, হিগুয়েইনের আরেক শট ফেরে পোস্টের কোনায় লেগে। আমরা ভাবি, এমন ঝড়ো আক্রমনে গোল একসময় আসবেই। আসে না গোল। খেলা চলে যায় সেই পেনাল্টি শুট আউটে। ভয়ে বুক কাপে: ২০০৪, ২০০৬ সালের কথা মনে পড়ে যায়।
তারপরও আবার আশা পাই। মাচেরানো লাল কার্ড দেখায় আর্মব্যান্ড এখন মেসির হাতে। ভাবি, ঈশ্বর এই চেয়েছিলেন। বলেছিলেন, এক ম্যারাডোনা তোদের কাদিয়ে শেষ করেছিল এক পর্ব। আরেক ম্যারাডোনার হাতে তোদের ভাগ্য দিলাম সপে।
হায় রে ভাগ্য। চার জন আর্জেন্টাইন পেনাল্টি শুটআউটে গোল করলেন। তারপরও কাঁদতে হল। কে কাঁদালেন।
আর্জেন্টিনায় এখন সবচেয়ে জনপ্রিয় ফুটবলার, জিপসি কার্লোস তেভেজ; আমাদের কার্তিলোজ।
কাঁদতেও যেন ভুলে গেছে আর্জেন্টাইনরা।
অভিশাপও দিতে পারি না।
এরা যে সব ফুটবল ঈশ্বরের উত্তরসুরী। ঈশ্বরের সন্তানদের কিভাবে অভিশাপ দেই!

সোমবার, ১১ জুলাই, ২০১১

ডিয়েগোর প্রত্যাবর্তন


ছিয়াশির আর্জেন্টিনা দলে কি সব ক জন ‘ক্রেজি’ ফুটবলার ছিলেন নাকি!
আজও বাতিস্তার শেষ সময়ের আচরণ দেখে কথাটা মনে হল। আবার সেই লাভেজ্জি এবং একেবারেই আনকোরা এক বিগিলাকে মাঠে নামানোর দুঃসাহস দেখালে ভদ্রলোক।
তবে আপাতত লোকটির ওপর রাগ ঝেড়ে ফেলতে হচ্ছে যে, অবশেষে নিজের একগুয়েমি থেকে সরে এসে হলেও আর্জেন্টিনার এখনকার সম্ভাব্য সেরা একাদশকে মাঠে নামালেন। ছেলেমানুষী না করে হিগুয়েইন, আগুয়েরো, ডি মারিয়া ও গ্যাগোকে সেরা একাদশে খেলালেন।
ফলটা কি হল?
আপাত দৃষ্টিতে আর্জেন্টিনার ৩-০ গোলের জয়।
আসলে এই ম্যাচে আর্জেন্টিনার প্রাপ্তি লিওনেল মেসির খেলা।মেসি-আগুয়েরো-ডি মারিয়া কম্বিনেশনে মারাত্মক বোঝা পড়া। আবারও বলি, সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি মেসিকে আর্জেন্টিনার করে পাওয়া।
তর্কস্বাপেক্ষে এটা বলা যায় যে, আর্জেন্টিনার হয়ে ক্যারিয়ারের সেরা ম্যাচটা খেললেন বিশ্বসেরা ফুটবলার লিওনেল মেসি।
বিশ্বকাপে আমরা নাইজেরিয়া, গ্রিসের বিপক্ষে মেসির কিছু ঝলক দেখেছি। তারপরও সেটা বার্সেলোনার মেসি ছিলেন না। কালও বার্সেলোনার পিক ফর্মের মেসি বলতে যা বোঝায়, তা হয়তো হলেন না।
সোজা হিসাব, সেটা হলেতো গোল পেতেন। কিন্তু যা করলেন, বার্সেলোনাতেও এমন কাণ্ড খুব একটা করেণ না। অন্তত ১৩ থেকে ১৫টি বল বাড়িয়েছেন, যেগুলো থেকে গোল হওয়া সম্ভব ছিল; এর মধ্যে ৩টি গোল হয়েছে।
বাকিগুলো না হওয়ার জন্য কিঞ্চিত দায় হিগুয়েইন ও শেষ পর্যায়ে লাভেজ্জির; কিছুটা ভাগ্যেরও। এসব হিসাব কোনো কাজের কথা নয়।
কথা হল, পুরো ম্যাচকে নিজের পায়ে মাতাতে থাকা এক মেসিকে পাওয়া গেল; যেটা আর্জেন্টাইনরা চায়।
কেন পাওয়া গেল? একটু খেলাটা বিশ্লেষন করে দেখা যাক।
লিওনেল মেসি বার্সেলোনায় যে জায়গায় খেলেন, বাতিস্তা নির্বোধের মতো সেই ফরোয়ার্ড পজিশনেই আর্জেন্টিনায় তাকে খেলাচ্ছিলেন। আরে ভাই, সে ক্ষেত্রেতো মেসিকে বল দেওয়ার জন্য জাভি-ইনিয়েস্তা চাই।
আপনার দলে জাভি-ইনিয়েস্তা কে? দুই ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার ক্যাম্বিয়াসো আর বানেগা! ফাউল!!
কাল যেটা হল মেসিকেই নামিয়ে আনা হল প্লে-মেকারের জায়গায়। তার সামনে ঠেলে দেওয়া হল আগুয়েরো ও হিগুয়েইনকে। বাতিস্তা মেসি কি জিনিস এটা বুঝতেই পারেননি; আমার মাঝে মাঝে সন্দেহ হয়, এই লোক স্প্যানিশ লিগের খেলা দেখে কি না!
আরে মেসি তো আগে প্লে-মেকার। বার্সেলোনার পজেশনে খেলাতে সমস্যা হলে তাকে এখানে নামিয়ে নিন। কাল নামানোর সঙ্গে সঙ্গে ফল। প্রতিটা বল মাঝ মাঠে ধরলেন আর ত্রাস তৈরি করে বল বাড়িয়ে দিলেন বক্সে।
এখানেই আগুয়েরো আর হিগুয়েইনের কৃতিত্ব। প্রথম ম্যাচে এরকম নিচে নেমে কয়েকবার বল বাড়িয়েছিলেন। কিন্তু তেভেজ তা পেলে আর পাসিং করেন না এবং লাভেজ্জির সে বল ধরারই ক্ষমতা নেই।
এখানেই হিগুয়েইন এক পা এগিয়ে গেলেন।গোল করতে পারেননি। কিন্তু এই রিয়াল স্ট্রাইকার প্রতিটি থ্রু-তে জায়গায় ছিলেন। ফলে প্রতিবারই আক্রমন জমেছে।
আর সেরা কাজটা করেছেন আগুয়েরো। মেসি বল দিয়েই সমানে মেসি-আগুয়েরো-হিগুয়েই-ডি মারিয়ার মধ্যে পাসিং করেছেন; তখন মনে হচ্ছিল: বার্সেলোনা। আসলে ওই যোগ্যতাটা থাকা চাই।
গাছ থেকে যোগ্যতা পড়ে না। চারটে আক্রমনভাগের খেলোয়াড়; চারটেই স্প্যানিশ শীর্ষ দলে খেলে। পাসিং এরা করতে পারবে না তো, ইতালির বাতিল লিগের খেলোয়াড়রা করবে এসে!
যাই হোক, অনেক মন্দ কথা বলেছি।
বাতিস্তার জন্য একটুও শুভ কামনা নেই। দল ভালো করুক।
কিন্তু শিরোনামের কি হল?
আগের দিন লিখেছিলাম: ফিরে আসুন ডিয়েগো। আজ লিখলাম: ডিয়েগোর প্রত্যাবর্তন!!
কই?


আপনি দেখেননি! আমি দেখেছি। মাঠে নব্বই মিনিট ধরে আমি ডিয়েগোর ছায়া দেখেছি। আমি নিশ্চিত খেলোয়াড়দের সঙ্গে ফোনালাপ তাদের উজ্জীবিত করেছে।
দ্বিতীয় গোল করার পর আগুয়েরো যেভাবে গিয়ে মেসিকে জড়িয়ে ধরলেন, তাতে স্পষ্ট দেখতে পেলাম: ডিয়েগো পাশে দাড়িয়ে তৃপ্তির হাসি হাসছেন।
তার মানসপুত্র ও তার জামাতা এভাবে জুটি বাধলে সেখানে ডিয়েগো না থেকে পারেন!!!!

বুধবার, ৬ জুলাই, ২০১১

ফিরে আসুন ডিয়েগো



২০০২ বিশ্বকাপের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে।
লাতিন আমেরিকা জোনের অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন, তখনকার ফিফা এক নম্বর হিসেবে বিশ্বকাপে ‘হটেস্ট ফেবারিট’ হয়ে কোরিয়া-জাপানে এসেছিল আর্জেন্টিনা।
কী সেই দল!
ভেরন, ক্যানিজিয়া, বাতিস্তুতা, ওর্তেগা, আইমার, আয়লা, ক্রেসপো; এদের ভিড়ে সে সময়ের ‘প্রডিজি’ স্যাভিওলার জায়গায় হয়নি ২৩ সদস্যের দলে! তর্কস্বাপেক্ষে আর্জেন্টিনার স্মরণকালের সেরা দল নিয়ে মার্সেলো বিয়েলসা শেষ পর্যন্ত কী করেছিলেন?
ইংল্যান্ডের সঙ্গে হেরে ও সুইডেনের সঙ্গে ড্র করে বিদায় নিয়েছিলেন প্রথম পর্ব থেকে। বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই পর্বতের মুষিক প্রসবের পর থেকে আর্জেন্টিনায় এক স্থায়ী ভিলেনের নাম: মার্সেলো বিয়েলসার।
সার্জিও বাতিস্তার জন্য কষ্ট লাগছে। এই লোকটিরও পরিণতি কি বিয়েলসার মতো হতে যাচ্ছে!
বিয়েলসারে সঙ্গে বাতিস্তার আরেকটি মিল হল দু জনই একটি করে অলিম্পিক সোনা জিতে এনে দিয়েছেন আর্জেন্টিনাকে। এবং অত্যন্ত শোকের ব্যাপার এই যে, বাতিস্তা ওই সোনার পদকটিকেই দেখিয়ে চলেছেন; আর কিচ্ছুটি তার মধ্যে দেখার মতো আছে বলে মনে হল না।
১৯৮৬ বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার এই সতীর্থ খেলোয়াড় হিসেবে আর্জেন্টিনার সেরা শ দুয়েকের তালিকাতেও থাকার কথা নয়। যুব দল নিয়ে কিছু সাফল্য ও ২০০৮ অলিম্পিক সোনার জোরে হয়ে গেলেন ম্যারাডোনার উত্তরসুরী।
ম্যারাডোনা চলে যাচ্ছেন যাচ্ছেন অবস্থায় স্পেনকে ৪-০ গোলে হারিয়ে বাতিস্তা একটা ধারণা তৈরি করলেন যে, তিনি আসলে অনেক বড় কোচ। কোচ হিসেবে বাতিস্তাকে ‘অনেক বড়’ বলা তো দূরে থাক, সাধারণ বলাই এখন কষ্ট।
যে লোকটি তার দলের সেরা খেলোয়াড় কারা এটা চেনে না, তাকে কোচ ভাবাটা কঠিন। আপনি হিগুয়েইন, ডি মারিয়া, আগুয়েরো, মিলিতো, পাস্তোরে, গ্যাগোকে বাইরে রেখে লাভেজ্জি, বানেগা, বেুড়িয়ে যাওয়া ক্যাম্বিয়াসোদের মাঠে নামাবেন; এটা ফাজলামো ছাড়া আর কিচ্ছু না।
প্রতিভা বস্তুটা আজকের দিনে আর গাছে ধরে না। এখন আর সান্তোসে পৃথিবীর অজ্ঞাতে একজন পেলের বেড়ে ওঠার সুযোগ নেই। এখন সান্তোসের নেইমার, গানসোদেরও সবাই চেনে। লাভেজ্জিরা যদি এমন কিছু খেলোয়াড়রই হতেন, রিয়াল মাদ্রিদে না হোক ম্যানসিচি, সাম্পদোরিয়ায় অন্তত দেখা যেত এসব ‘কূলমার্তন্ড’কে।
তা নয়। বাতিস্তা ভাবলেন উনি জহেরতের খনি আবিস্কার করে ফেলেছেন!
খেলোয়াড় নির্বাচনও এই লোকের প্রধান সমস্যা নয়। সে সমস্যা তো ম্যারাডোনারও ছিল। ম্যারাডোনাও জানেত্তিকে বাদে বিশ্বকাপ দল করেছিলেন। গন্ডগোল করে ভেরনকে একাদশে ঠাই দেননি। ম্যারাডোনা-বাতিস্তা কেউই বড় কোচ নয়।
তারপরও ম্যারাডোনা থাকলে অন্তত এই করুন ফুটবল দেখতে হত না। ম্যারাডোনার নামে খাতিরে এবং লোকটির সম্মান রাখতে যাকেই মাঠে নামানো হত, সে একটু জীবন দিয়ে খেলার চেষ্টা করত। যেটা আমরা দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে দেখেছিলাম; হারুক-জিতুক দলটি অন্তত অনুপ্রানিত ছিল।
মেসির আর্ন্তজাতিক ক্যারিয়ারে সম্ভবত একমাত্র ওই দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপেই সে সতস্ফুর্তভাবে খেলেছে। কারণ, নিশ্চয়ই ম্যারাডোনা। বাতিস্তা মেসিকে নিয়ে এতো চাপাবাজি করলেন, অথচ ছেলেটিকে এই দু ম্যাচ দেখে মনে হল, খেলাটা ভুলে বার্সেলোনায় ফেলে এসেছে; এখন খুজে দেখছে কোথায় পাওয়া যায়।
বাতিস্তা মোটিভেটর হিসেবে কতোবড় সর্বনেশে তার প্রমান কার্লোস তেভেজ। তেভেজের ক্যারিয়ারের ৫৯ ম্যাচের মধ্যে অন্তত ৩০টি আর্ন্তজাতিক ম্যাচই দেখেছি। এই অ্যাপাচিকে আমি কোনোদিন এতোটা নিস্প্রভ দেখিনি আকাশী-নীল জার্সি গায়ে। আর্জেন্টিনা ০-৪ গোলে পিছিয়ে তারপরও তেভেজের প্রানান্ত ফুটবল দেখলে মনে হয়েছে, সে একাই ম্যাচ জেতাবে! আর সেই ছেলেটিকে পর্যন্ত বাতিস্তা ‘ম্যারাডোনার চামচা-টামচা’ বলে একেবারে প্রানহীন করে রেখেছে মাঠে।



সে যাকগে আমার বাড়িও আর্জেন্টিনায় না; প্রভুর ইচ্ছায় আর্জেন্টিনায় বিয়েও করিনি। ফলে সর্বনাশ ওদের হলে আমার কিচ্ছু না। বাতিস্তা ভিলেন হলে ফল সেই টের পাবেন। আমা কী?
আসলেই আমার কিচ্ছু না! বলি বটে, কিচ্ছু না; কিন্তু আকাশী-নীল জার্সি গোয়ে এই হারতে হারতে ড্র করা আর নিস্প্রান চলা ফেরা দেখলে বুকের কোথায় যেন একটু যন্ত্রনা করে ওঠে।
কোথায় ম্যারাডোনা? ফিরে আসুন, রক্ষা করুন আর্জেন্টিনাকে। ফিরে আসুন ডিয়েগো।

রবিবার, ৩ জুলাই, ২০১১

লোটাস কামাল: আইসিসি সভাপতি!!!




আ হ ম মোস্তফা কামাল: এফসেএ, এমপি এবং একটি সংসদীয় কমিটির প্রধান।
মানুষ হিসেবে মোস্তফা কামাল সাহেবের অতীত ও বর্তমান বলে, তিনি একজন যোগ্য মানুষ। শুনেছি, সেই পাকিস্তান আমলে দুই পাকিস্তান মিলিয়ে সিএ-এর সেরা ছাত্র হিসেবে ‘লোটাস’ উপাধি পেয়েছিলেন। সে জন্যই ঘনিষ্ঠরা তাকে লোটাস কামাল বলে ডাকেন।
সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে, মানে সবকিছু যদি মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী এগোয়, তাহলে ২০১৪ সালে আইসিসির সভাপতি হতে যাচ্ছেন আমাদের এই লোটাস কামাল। আমি সবিনয়ে এই জায়গাটা নিয়ে একটু কথা বলতে চাই।
আগে বলি, কামাল সাহেব কিভাবে আইসিসির সভাপতি হতে পারেন।
আইসিসি বর্তমানে তার সভাপতি নির্বাচন করে আবর্তন (রোটেশন) নীতিতে। এই নীতিতে প্রতি দুটি করে দেশ নির্দিষ্ট সময় অন্তর সভাপতি ও সহসভাপতি নির্বাচন করার সুযোগ পায়।
সম্প্রতি ভারতসহ কিছু দেশ মনে করছে, আইসিসির এই আবর্তন নীতিটি আর থাকা উচিত নয়। এখানে সুস্পষ্ট ভোটাভুটির মাধ্যমেই সভাপতি নির্বাচন করা উচিত। মনে করার কারণ স্পষ্ট: ভারতের আবর্তন কোটা শরদ পাওয়ারকে দিয়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে। ফলে তারা নির্বাচন চালু করে আবার ভারতীয় কাউকে ওই পদে বসাতে চায়।
সদ্য শেষ হওয়া হংকং কংগ্রেসেই আবর্তন নীতি বাতিল হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি দেশ (সম্ভবত দক্ষিণ আফ্রিকা)-এর আপত্তিতে তা হতে পারেনি।
বাংলাদেশ-পাকিস্তানের যুক্তি সহজ; ২০১৪ সালে আবর্তন অনুযায়ী সভাপতি-সহসভাপতি তাদের দেশ থেকে দেওয়ার কথা।
অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে সে পর্যন্ত এই নীতি টিকে যাবে। অর্থাৎ, ২০১৪ সালে আইসিসির প্রধান দুটি পদ অলঙ্কৃত করবেন পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সে সময়ের বোর্ড সভাপতি। এখানে একটু ফুটনোট আছে। সর্বশেষ বাংলাদেশ-পাকিস্তান যখন এই সুযোগ পেয়েছিল, তখন প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন পাকিস্তানের এহসান মানি। সে সময়ের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এবার প্রেসিডেন্ট পদটা বাংলাদেশকে ছেড়ে দেওয়ার কথা পাকিস্তানের।
এবার দেখা যাক, কামাল সাহেবের স্বপ্নটা কি? তিনি যদি সেই পর্যন্ত পদে থাকতে পারেন, তাহলে তারই বসার কথা ক্রিকেটের সর্বোচ্চ চেয়ারটিতে। অবশ্য এর মধ্যে দুটি নির্বাচন প্রভাব ফেলবে। এক. বোর্ড সভাপতি পদে নির্বাচন করতে হবে। দুই. জাতীয় নির্বাচন হয়ে যাবে।
স্বাভাবিকভাবেই আওয়ামী নেতা কামাল সাহেব ধরে নিচ্ছেন, জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামীলিগ আবার ক্ষমতায় আসবে।(যদিও সেটা ভোটেই ঠিক হবে শেষ পর্যন্ত!)
থাকল বাকি বোর্ড সভাপতি পদে নির্বাচন। এখানেও কামাল সাহেবের জোর আশাবাদের কারণ আছে। আমাদের দেশে এই ধরণের নির্বাচন কখনোই সত্যিকারের ভোটের প্রতিফলন করে না। বিসিবি আইসিসির চাপে নির্বাচন ঠিকই দেবে। কিন্তু সেখান থেকে আওয়ামীলিগ মনোনীত প্রার্থীই পাশ করে আসবে।
কারণ, এই ভোটে যারা কাউন্সিলর তারা এতো বিপ্লবী নন যে, আওয়ামীলিগ যাকে চায় তাকে না এনে অন্য কাউকে ভোট দিয়ে প্রেসিডেন্ট বানাবেন। সেক্ষেত্রে আওয়ামীলিগ তাকে মনোনয়ন দিলে কামাল সাহেবই যে নির্বাচিত হবেন, তা নিয়ে সন্দেহ করার সুযোগ নেই।
এ পর্যন্ত ছক ঠিক থাকলে আ হ ম মোস্তফা কামালের আইসিসি সভাপতি হওয়া খুব সম্ভব।
আমি গত দু দিন ধরে এই ব্যাপারটি নিয়ে খুব শঙ্কার মধ্যে আছি। সবকিছু এভাবে হলে সত্যিই যদি কামাল সাহেব আইসিসি সভাপতি হয়ে যান, সেটা ছোটখাটো একটা কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে।
কামাল সাহেবকে এই ক বছর ধরে বিসিবি সভাপতি হিসেবে যা কান্ড কারখানা করতে দেখেছি, তাতে এরকম একটা বৈশ্বিক চেয়ারে তিনি বসলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিতেও টান পড়ে যেতে পারে।
প্রথম কথা হল, এই ভদ্রলোক সংবাদ মাধ্যম (বিশেষ করে টিভি ক্যামেরার সামনে) উল্টোপাল্টা মন্তব্য, ভবিষ্যত না ভেবে কথা বলে ফেলতে খুব ওস্তাদ। কয়েকবার করে এরকম কেলেঙ্কারি তিনি করেছেন। একবার বলে দিলেন, ল্যান্স ক্লুজনার বাংলাদেশের বোলিং কোচ হচ্ছেন; কথাবার্তা চূড়ান্ত। পরে ক্লুজনার বললেন, তার সঙ্গে তেমন কোনো কথাই হয়নি।
এই কিছুদিন আগে বললেন, দক্ষিন আফ্রিকান ভিনসেন্ট বার্নেসের কথা বললেন। বললেন, বার্নেসের সঙ্গে তার কথাবার্তা চূড়ান্ত; তিনিই হচ্ছেন জাতীয় দলের কোচ। ক দিন পর বার্নেস বললেন, তাকে প্রাথমিক একটা প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, তিনি ‘হ্যা, না’ কিছু বলেননি।
বুঝুন অবস্থাটা।
এই দুটো উদাহরন আপাতত সামনে এলো। এ ছাড়া এরকম গুলিয়ে ফেলার ঘটনা কামাল সাহেবের আরও অনেক পাওয়া যাবে। এখন কথা হল, আইসিসির চেয়ারে বসে এরকম সব কান্ড কারখানা করতে থাকলে, সেই দায়টা লোকে কাকে দেবে?
আমরা যখন শরদ পাওয়ারকে গালি দেই, ‘ভারতীয় রাজনীতিবিদ’ বলেই গালি দেই। আমাদেরও কি তাহলে একদিন এই গালি শুনতে হবে?
এই প্রশ্নটার উত্তর একজন মানুষই দিতে পারেন: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনিই ঠিক করতে পারেন, কামাল সাহেব বিসিবি সভাপতি পদে টিকে থাকবেন কিনা। তিনিই ঠিক করতে পারেন, বাংলাদেশকে এমন বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলা হবে কি না।
প্রশ্ন হতে পারে, তাহলে আওয়ামী মনোনীত বিসিবি সভাপতি প্রার্থী কে হবেন?
স্মৃতিভ্রষ্ট না হলে যোগ্যতম মানুষটির নাম সবার একবাক্যে বলে ওঠার কথা: জনাব সাবের হোসেন চৌধুরী।
আমি সাবের হোসেন চৌধুরীর খাইও না, পরিও না। তার পত্রিকাতেও কোনোদিন কাজ করিনি। কিন্তু বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি, ক্রিকেট সংগঠক বলতে যা বোঝায়; তা এই দেশে একজন থাকলেও তিনি সাবের হোসেন চৌধুরী।
যে মানুষটি ১৯৯৭ সালে বলেন, আমরা টেস্ট খেলবো। এবং সেই অনুযায়ী টেস্ট স্টাটাস এনে দিতে পারেন, তার বিসিবি সভাপতি হতে আর কোনো যোগ্যতা লাগে না। দুরদর্শিতা বলুন, পরিকল্পনা বলুন; মিথ্যের এই রাজনীতির যুগে একমাত্র সাবের হোসেন চৌধুরীর পক্ষে বাংলাদেশ থেকে গিয়ে আইসিসির ওই চেয়ারটায় বসার সত্যিকারের যোগ্যতা আছে।
কিন্তু কথা হল, এই অনুরোধ আমরা কাকে করবো? প্রধানমন্ত্রীকে!
তিনি তো অদ্ভুত এক নীতি নিয়ে বসে আছেন। যে নীতিতে তথাকথিত সংস্কারপন্থিদের কোনো ঠাই তার কাছে নেই। সাবের ভাই যতোদুর জানি বছর আটেক আগেও শেখ হাসিনার প্রিয় মানুষগুলোর একজন ছিলেন। কিন্তু কি এক ওয়ান ইলেভেন এলো। বদলে গেল সব।
সাবের হোসেন চৌধুরীকে রেখে একজন শেয়ার কেলেঙ্কারির হোতাকে (নিন্দুকের ভাষায়)বসানো হল বিসিবি সভাপতির চেয়ারে। এই কাজ করা হয়েছে ক্রীড়ামন্ত্রী নির্বাচনের ক্ষেত্রেও।
মানুষ কেমন জানি না। ক্রীড়ামন্ত্রী হিসেবে ওবায়দুল কাদের অন্তত যাচ্ছেতাই ছিলেন না। কিন্তু শুধু সংস্কারপন্থি নন, এই যোগ্যতায় ক্রীড়ামন্ত্রী হয়ে দিনের পর দিন চায়ের আড্ডায় হাসির খোরাক হয়ে যাচ্ছেন একজন আহাদ আলী সরকার।
আমি আহাদ সাহেব বা কামাল সাহেবকে ছোট করছি না। তবে তারা আসলে এই পদগুলোর জন্য নন।
যদি প্রধানমন্ত্রী কোনোদিন, কোনো দূর্ঘটনাচক্রে এই লেখা পড়েন, তাহলে একটা অনুরোধ করবো: যোগ্য মানুষগুলোর ভুলটা ভুলে যাওয়াও একটা যোগ্যতা। এতে আর কিছু না হোক দেশের ভাবমূর্তি রক্ষা পায়।
একবারের জন্য হলেও সব ভুলে গিয়ে দেশের ভাবমূর্তির কথা ভেবে বিসিবি সভাপতি ও ক্রীড়ামন্ত্রীর ব্যাপারটি আরেকবার বিচেনা করুন।

[এটি নিতান্তই নিস্ফল ক্রন্দন। এই ক্রন্দনে কারো লাভ হবে না, জানি। তবে যারা পড়ছেন, তাদের নিশ্চিত করতে চাই আ হ ম মোস্তফা কামাল বা আহাদ আলী সরকারকে হেয় করার কোনো উদ্দেশ্য আমার নেই।]

বুধবার, ২৯ জুন, ২০১১

বাংলাদেশ বাংলাদেশ



অনেক দিন মাঠে গিয়ে বাংলাদেশ দলের ফুটবল দেখা হয় না। বাংলাদেশ দলের আর্ন্তজাতিক ম্যাচই তো খুব একটা হয় না। তারওপর পেশাগতভাবে একটু বেশি ক্রিকেট-সম্পৃক্ত বলে যা কিছু ম্যাচ হয়, মাঠে যাওয়া হয়ে ওঠে না।
প্রায় বছর দুয়েক পর কাল মাঠে বসে জাতীয় দলের খেলা দেখলাম।
কী সৌভাগ্য! দলের অসামান্য এক জয়ের স্বাক্ষী হলাম। পাকিস্তানের বিপক্ষে খেলা দেখতে দেখতে বারবার মনে হচ্ছিল, ছেলেগুলোর ফুটবল নিয়ে এতো মন্দ কথা কেন বলে লোকেরা! এই বৃষ্টি মাঠে, কী অসাধারণ বল নিয়ন্ত্রন করল তারা। যেখানে দ্বিগুন শক্তি লাগে, এই মাঠে দৌড়াতে, সেখানে মনে হল স্বাভাবিকের চেয়েও দ্রুত ছুটছে আমাদের ফুটবলাররা। জাহিদ-এমিলি যেন মাঠের এ প্রান্ত, ও প্রান্ত করে বেড়ালো চোখের পলকে। এই জঘন্য মাঠেও তারা পাস করল, রিসিভ করল, ব্যাক-ভলি করলো, ওভার ল্যাপ করলো; দারুন!
এতোটুকু প্রস্তুতির সুযোগ পায় না, সারাবছর কোচিং বলে কিছু নেই, নেই আধুনিক সুযোগ সুবিধে; তারপরও ছেলেগুলো এই যা করলো, তাতে মন ভরে যাওয়ার কথা।
তবে আমার মনটা আসলে ভরিয়ে দিলেন মাঠের বাইরের কয়েক জন মানুষ: দর্শক। ঝরো ঝরো বৃষ্টির মধ্যে গ্যালারিতে বসে সমানে তারা চিৎকার করছেন ‘বাংলাদেশ, বাংলাদেশ’ বলে। মাথার ওপর আকাশ ছাড়া আর কিচ্ছুটি নেই। সারা শরীর ভিজে চুপচুপ করছে, বৃষ্টিতে চোখ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে; তার মধ্যেও চলছে মানুষগুলোর চিৎকার।
কয়েকটা ছেলে, পোশাক দেখে মনে হল মাদ্রাসার ছাত্র, পাজামা-পাঞ্জাবী সব ভিজে একসার। দেখে মনে হয় মাত্র পুকুর থেকে উঠে এলো। ওই প্রবল বৃষ্টির মধ্যে তারা বাংলাদেশ বাংলাদেশ বলে সোচ্চার। একজন মানুষ, দেখে মনে হল কোনো চায়ের দোকানদান বা রিকশাচালক হবে; পরনের লুঙ্গি-জামা সব ভিজে চুপচুপে। একটা চেয়ারের ওপর দাড়িয়ে তিনিও দু হাত শূন্যে তুলে চিৎকার করছেন।
ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে। মাঠের খেলোয়াড়দেরও আর ঠিকমতো চেনা যাচ্ছে না। জায়ান্ট স্ক্রিনে তাকিয়ে মনে হচ্ছে বিদেশী কোনো খেলার সম্প্রচার দেখছি। তুষারপাতের মধ্যে বল নিয়ে ছুটে চলেছেন মেসি-জাভিরা।
ক্যামেরা ঘুরছে গ্যালারিতে। মনে হচ্ছে এক টুকরো বাংলাদেশ যেন উঠে এসেছে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের ছোট্ট এই গ্যালারিতে। যে বাংলাদেশ বৃষ্টি মানে না, ঝড় মানে না; শুধু জানে বাংলাদেশ, বাংলাদেশ।

বৃহস্পতিবার, ২৩ জুন, ২০১১

প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চার্য নিয়ে দু কথা

কতোদিন হল? বছর দুয়েক মনে হয়। 
শুরু হয়েছে, প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চার্য্য নির্বাচনের এক অফূরন্ত প্রক্রিয়া। শুরুতে শুরুতে আমিও ভোট দিয়েছি নিউ সেভেন ওয়ান্ডার্স সাইটে গিয়ে। এরপর প্রতিটা ব্লগ, পত্রিকা, টেলিভিশনে প্রচারনা; নানা অনুষ্ঠানে বক্তারা প্রাসঙ্গিক, অপ্রাসঙ্গিকভাবে যেমন বিষয়টির অবতারনা করেছেন, তাদের মানুষের দেশপ্রেম দেখে মুগ্ধ হয়েছি। 
একসময় আমরা আবিস্কার করেছি, দেশের মন্ত্রীরা এ নিয়ে কথা বলছেন, খোদ প্রধানমন্ত্রী কথা বলছেন।দেখেছি, দেশে শাহরুখ খান এলে তাকে দিয়ে ভোট দেওয়ানোর প্রতিশ্রুতি, দেখেছি এক মন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি: এখন থেকে এসএমএসেও সুন্দরবনকে ভোট দেওয়া যাবে। 
আমি মুগ্ধ হয়েছি। মনে হয়েছে, আসলেই দেশের মানুষগুলো দেশ নিয়ে পাগলপারা। 
এই মনে হওয়া থেকে পিছিয়ে আসার কোনো কারণ ঘটেনি। মানুষ এখনও সমানে এই ‘ভোট দিন’ প্রচারণা চালু রেখেছে। কিন্তু আমার একটা সন্দেহ গত কিছুদিন ধরে তৈরি হয়েছে: আমার কার পেছনে ছুটছি? এই যে ভোটাভুটি করছি, এতে লাভ-ক্ষতি কার কী হচ্ছে? কে বললো এভাবে সপ্তাশ্চার্য্য নির্বাচন করতে?
ব্যক্তিগতভাবে আমি এ ধরণের কোনো সপ্তাশ্চার্য্য চিহ্নিত করারই বিপক্ষে। এটা এক ধরণের বৈষম্য ও ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ করে। সে যাই হোক, আমার এসব ‘আদ্যিকেলে’ কথা তো দুনিয়া চলবে না। এখন জাতিসংঘ এরকম কোনো উদ্যোগ নিলে, সেটার তো একটা সার্বজনীনতা থাকবেই। 
আমরা শুনতে পেলাম, প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চার্য্য যারা নির্বাচন করছেন, তারা নাকি ইউনেস্কোর (জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সংস্থা) অনুমোদনক্রমে কাজটা করছেন। কিন্তু ইউনেস্কোর ওয়েবসাইট কি বলছে? সেখানে ঢুকে বিস্ময়কর এক তথ্য আবিস্কার করা গেল। 
তাদের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে পরিস্কার বলা হয়েছে, ‘এরকম কোনো ব্যক্তি উদ্যোগে ইউনেস্কো জড়িত থাকতে পারে না।’
বিজ্ঞপ্তিটি এরকম: 
There is no comparison between Mr. Weber’s mediatised campaign and the scientific and educational work resulting from the inscription of sites on UNESCO’s World Heritage List. The list of the 7 New Wonders of the World will be the result of a private undertaking, reflecting only the opinions of those with access to the Internet and not the entire world. This initiative cannot, in any significant and sustainable manner, contribute to the preservation of sites elected by this public.

June 20, 2007
The United Nations Educational, Scientific and Cultural Organization (UNESCO)
press release

মানে, সোজা কথা তারা এই নির্বাচনের দায় নিচ্ছে না। তার মানে এই যে প্রক্রিয়াটা, পুরোটাই একটি সুইজারল্যান্ড ভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানের কাজ! তাদের লাভ কী? প্রথম লাভ তো, সোজা কথা, প্রচারনা। দ্বিতীয়ত আরও কিছু অর্থনৈতিক লাভালাভের অভিযোগ বিভিন্ন পক্ষ থেকে পাওয়া যাচ্ছে। 
এ ছাড়া মোবাইল, ফোন, ওয়েবসসাইট কোম্পানিগুলোর মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার প্রাপ্তির ব্যাপারও জড়িত এই পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে।
এখন আমাদের কতোগুলো সোজা প্রশ্ন। এরকম একটি অস্বীকৃত প্রকল্পের জন্য এভাবে একটা রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে উঠেপড়ে লাগাটা কি মানানসই ব্যাপার? এভাবে ভোটাভুটি করে কি আদৌ কোনো সিদ্ধান্তে পৌছানো সম্ভব? কোনটি সপ্তাশ্চার্য, কোনটি নয়; সেটা নির্বাচন করতে পারেন বিশেষজ্ঞরা; আম জনতার, বিশেষ করে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের ভোট এখানে কেন মূল ভূমিকা রাখছে?
আমার ফেসবুক বন্ধু জোবায়ের তনিম ভালো বলছিলেন, ‘একটা ব্যাপার চিন্তা করেন , যে দেশে জনসংখ্যা সব চেয়ে বেশি , তারা একটু চেষ্টা করলেই তাদের নদী নালা, খাল বিল ইত্যাদি সবকিছুকেই সপ্তম আশ্চর্য নির্বাচিত করতে পারবে ‘
ঘটনা সত্যি। 
এরপরও কথা থাকে। একটা কথা হল, প্লাটফর্ম যাই হোক, আমরা শুধু ভোট দিয়ে দেশের দুইটি জায়গাকে এভাবে পরিচিত করতে পারলে লাভ তো আমাদেরই। আমাদের পর্যটন শিল্প তাতে বিকশিত হবে, বিদেশী মূদ্রা আসবে। 
আসলেই তাই? পর্যটকরা কি এসব তালিকা দেখে কোথাও বেড়াতে যান? যেসব পর্যটক বেড়াতে বের হন, তারা কেউ সুন্দরবন বা কক্সবাজারের নাম জানেন না বলে আসেননি; এমন ঘটনা দেখলেও বিশ্বাস করার কথা নয়। 
আমরা পর্যটক আকর্ষন করতে পারি না, আমাদের নোংরা ব্যবস্থাপনা, যোগাযোগ-আবাসন সমস্যার কারণে। আরও অনেক সমস্যার কারণে। ফলে দুনিয়ার প্রত্যেককে সুন্দরবনের নাম মুখস্থ করিয়ে দিলেও এই সেক্টরগুলোতে কাজ না করলে পর্যটকও আসবে না, এক নম্বরও হওয়া হবে না। 

(এই লেখা কাউকে নিরুৎসাহিত করার জন্য নয়। যারা সুন্দরবনের পক্ষে প্রচারনা চালাচ্ছেন, তাদের জন্য শুভকামনা। তাদের পরিশ্রমকে স্যালুট করি)

আমার কান্না, আমার প্রাপ্তি

একটা অদ্ভুড়ে সময় পার করলাম। 
বাবা হবো বলে মনে মনে মচ্ছব করছিলাম। আগে কখনো বাবা হইনি তো, তাই!!! 
কি বিচিত্র। হঠাৎ একদিন চিকিৎসকরা বললেন, আমার বৌ-এর গর্ভের সন্তানটি ঝুকির মধ্যে আছে। একদিন, পরশু মাঝরাতে পৃথিবীতে আসার আগেই পৃথিবী ছেড়ে গেল প্রানটি। 
এতে আমার আর এমন কী হয়েছে? আমি তো মচ্ছব করে সময় কাটাচ্ছিলাম। আর আমার বৌ তিনটে মাস ধরে তিল তিল করে প্রানটা বড় করে তুলছিল। অনেক স্বপ্নও দেখছিল। এখন এই অভিশাপের জালাটা টের পাচ্ছে সে। 
যখন অপারেশন থিয়েটার থেকে ওকে বের করে আনা হল; অর্ধ চেতন অবস্থায় আমার দিকে চেয়ে বড় বড় চোখ করে জিজ্ঞেস করলো, ‘ও কই?’ কেউ ভাবলো আমার বৌ তার মাকে খুজছে, কেউ বললো আমাকে খুজছে; আমি তো বুঝলাম, ও কাকে খোজে!!
নিজেকে অত্যন্ত অযোগ্য, অপদার্থ একজন মানুষ মনে হচ্ছে; যে কিনা একটা মেয়ের সন্তানের নিশ্চয়তা দিতে পারল না।
যাক, এসব ব্যক্তিগত ছিচকাদুনির জায়গা ব্লগ নয়। তারপরও প্রসঙ্গটা তুলতে হল ঊপাধিরজন্য। সে খুব আন্তরিকতার সঙ্গে গতকাল জানতে চেয়েছিল, আমি কেন ইদানিং ব্লগে পোস্ট দিচ্ছি না। কারণটা এই। 
তবে এই কারণ জানাতে গিয়ে একটু মধুর অভিজ্ঞতাও জানাই। মানুষ চরম বিপদগ্রস্থ না হলেও অনেক কিছু জানতে পারে না। এরকম সময়গুলোতে অনেক নতুন দুনিয়া উন্মোচিত হয়। আমার সামনে উন্মোচিত হল বন্ধুত্বের, সহানুভূতির বিচিত্র এক দুনিয়া। 
পরশু ঘটনা শুরু হয়ে যাওয়ার পর থেকে আমি দেখলাম, আমার চেনা আড্ডাবাজ, হালকা চালের মানুষগুলো কেমন সৈনিকের মতো হয়ে উঠল। মুখে একটা শব্দ না করেতারা কেমনভাবে এগিয়ে এলো। আমার প্রতিবেশী রাজু ভাই তখন ঘুমাচ্ছিলেন; দরজায় টোকা দিতেই শর্টপ্যান্ট আর টি-শার্ট পরে আমাদের সঙ্গে অ্যাম্বুলেন্সে চড়ে বসলেন। 
সিমু নাসের আর আসিফ এন্তাজ রবি যেন ফোনের জন্য অপেক্ষা করছিল। সঙ্গে আরও দুই বন্ধু নিয়ে হাজির। আমি শুধু মুখ কালো করে হাসপাতালে বসে রইলাম। সারা রাত কোথায় টাকা, কোথায় রেজিস্ট্রেশন, কোথায় ডাক্তার; ছুটে চললো এই মানুষগুলো। ভোর বেলা থেকে আরিফ রনি হাজির, রাজীব হাসান চোখ লাল করে এসে বললো, ‘সঙ্গে সঙ্গে একটা ফোন দিলেন না! আমি একটা কিছু অনুমান করে মোটর সাইকেল গ্যারেজে তুলিনি রাতে!’
আমার বন্ধুরা জানেন আমার অর্থ-বিত্ত কতো সমৃদ্ধ। সকাল থেকে ফোনের পর ফোন, ‘টাকা নিয়ে আসবো?’ তাদের নাম আলাদা করে বলে আসলেই ছোট করার ঠিক হবে না। এদিকে দীপ্ররা কয়েক জন ফেসবুকে আমার বৌ-এর জন্য রক্ত সংগ্রহের চেষ্টা শুরু করল। তাদের কাছে থেকে সাড়া আসতে শুরু হল।
একজন আপু, ফারজানা আপু; যাকে আমি কোনোদিন দেখিইনি, বারবার খবর নিচ্ছেন, ‘বৌ সুস্থ আছে তো?’ ফোনে আমার প্রিয় মানুষগুলো নোমান, শুভ্রদা, মামুন ভাই, বাবু ভাই, কায়সার ভাই; এমন উদ্বিগ্ন যেন বাংলাদেশের টেস্ট স্টাটাস কেড়ে নেওয়া হচ্ছে! 
দিনশেষে সর্বশান্ত হয়ে আমি যখন বাসায় ফিরছি, তখন হঠাৎ করে মনে হল, ঢাকায় আটটি বছর যে পার করে ফেললাম, টাকা-পয়সা-বাড়ি-গাড়ি কিছুই তো জমাতে পারলাম না।
তবে এই আট বছরে যতো ভালোবাসা জমিয়েছি, তা দেখে শিল্পপতিরা ঈর্ষা করতে পারেন।

লাদেনের মরার উপায় নেই।



ওসামা বিন লাদেন নাকি মারা গেছেন!
বারাক ওবামা, যিনি শান্তিতে নোবেল পেয়েছেন, মহা আনন্দের সঙ্গে এই হত্যাকান্ডের সত্যতা নিশ্চিত করে জাতির এবং বিশ্বের উদ্দেশ্যে ভাষন দিয়েছেন।
আমাদের প্রেসিডেন্ট একটা জাতির উদ্দেশ্যে ভাষন দেন; আর ওবামারা পুরো দুনিয়ার উদ্দেশ্যে!
বিন লাদেন হঠাৎ কেন মরে গেলেন? কি প্রয়োজন হয়েছিল।
বিনা প্রয়োজনে তো লাদেন কিছু করেন না। বিশেষ করে ওবামা সাহেবদের উপকারে লাগে না, এমন কাজ তো বিন লাদেনের করার কথা না! যখনই আম্রিকার প্রয়োজন হয়, তখনই ভদ্রলোক তাদের পাশে এসে দাড়াতেন। এবার কি প্রয়োজনে মরে গেলেন!!!
বিশ্বাস হচ্ছে না?
সেই যে আফগানিস্তানে যখন কমুনিস্টদের দমানো দরকার, তখন দিব্যি সেখানে মার্কিন আর ইসরাইলি অস্ত্র নিয়ে হাজির বিন লাদেন সাহেব। কমুনিস্টরা গেল, বিন লাদেনকে প্রকাশ্যে ‘বন্ধু’ থেকে ‘শত্রু’ তালিকায় নিয়ে গেলেন আম্রিকান সাহেবরা।
তাতে লাদেন সাহেব মোটেও রাগ করেননি। মার্কিন অর্থনীতির ধ্বস সামাল দিতে তিনি হামলা চালান ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে, মার্কিন নির্বাচনের আগের দিন আল জাজিরায় বক্তৃতা দিয়ে আবার ক্ষমতায় এনে দেন বুশ ভাইকে।
যখন পাকিস্তান-আফগানিস্তান-চীন সীমান্তে মার্কিন ঘাটি তৈরি করা দরকার হয়, তখন গুপ্ত স্থান ছেড়ে ওবামা নাকি চলে আসেন তোরাবোরা পর্বতে। ওখানে হামলা চালিয়ে বেশ দখল করে নেওয়া যায় জায়গাটা। পাকিস্তানকে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করে ভারত-বন্ধুত্ব বাড়ানো যায় এবং চীনের পাশে দেয়ালটা শক্ত হয়।
ঠিক যেখানে যেখানে চীন সীমান্তে আক্রমন চালানো দরকার ছিল লাদেন যেখানে সেখানে গিয়ে পালাতেন। কী মজা!!!
আম্রিকানদের এমন বন্ধু তাদের প্রয়োজন ছাড়া দেহ রাখবেন, এ বিশ্বাস হয় না।
দুর্মুখেরা বলছে, লাদেনের মৃতদেহর এখন অনেক দাম। ওই দেহ দেখিয়ে অপরাজেয় হয়ে ওঠা গাদ্দাফি বাহিনীকে দমন করে ফেলা যাবে। ওতে গাদ্দাফি অনুচরদের ‘মর‌্যাল ডিফিট’ হবে। কে জানে, নিন্দুকের কথা সত্যি হতেও পারে। চীন সীমান্তের এ পাশটায় লাদের প্রয়োজন ফুরিয়েছিল।তাই শেষ উপকারটা তার দেহ দিয়েই হল!!!

লাদেনের মৃতদেহ মারকিনিদের কী কী উপকার করবে সেটা চমস্কিরা হিসেব করবেন। আমরা আপাতত একটা ব্যাপার বেশ বুঝতে পারছি। বেচারার মৃত্যুর ভেতর দিয়ে এবার পাকিস্তান আর আফগানিস্তান যদি একটু শান্তি পায়!
এখন তো লাদেন নেই, কাকে খুজতে হামলা চালাবে যুক্তরাষ্ট্র। এবার তাহলে বোমাবর্ষন বন্ধ হবে?

(দৈববানী) রে মূর্খ! এক লাদেন নেই তো কী হয়েছে। বোমা ফেলার দরকার হলে কালই আরেকটা কাউকে বানিয়ে নেব। কালই কেউ একজন আর জাজিরায় মুখ খুলবে, ‘আমি লাদেনের উত্তরসুরী।’
তাকে পাকড়াও করতে আবার শুরু হবে ক্লাস্টার বোম্বিং!!!
লাদেনের মরার উপায় নেই।

নোট: এই পোস্টটি স্টিকি থাকা অবস্থায় লেখা নিয়ে তুমুল আলোচনা হয়। মূলত ‘কোহিন’ নামে একজনের সঙ্গে বিতর্কটা দারুণ জমে ওঠে। সেই বিতর্কটা:




কোহিন০৩ মে ২০১১, ১৪:২৯
আদাব দেবব্রতবাবু
আপনার রচনার কায়দাটি নতুন কিছুই নহে।
ঘুরাইয়া ফিরাইয়া ইনাইয়া বিনাইয়া যাহা কহিলেন তাহার সারমর্ম হইতেছে ওসামা বিন লাদেন ছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দালাল!!!
এইটা অস্বীকার করিবার উপায় নাই যে একসময় রুশ-ভল্লুকদের হাত হইতে আফগানিস্তানকে মুক্ত করিবার জন্য লাদেন মার্কিন সহায়তা গ্রহণ করিয়াছিলেন। কিন্তু সেইকারণে তিনি নিজের মান-সম্মান, নীতি, ঈমান---এইসব বিসর্জন দেন নাই। বরং মার্কিনীদের বিরুদ্ধেই সমমতন রুখিয়া দাড়াইয়াছিলেন। তিনি আমাদের দেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মানুষগুলির মতন নহে। ভারত নানাভাবে হেনস্থা করিলেও ১৯৭১ সালের সহায়তার কথা স্মরণ করিয়া মুখে কুলুপ আটিয়া রাখেন।
যখন প্রতিবাদ করিবার কথা তখন ঠিকই প্রতিবাদ করিয়াছেন। মার্কিন-মুলুকে গিয়া হামলার সাহস দেখাইয়াছেন। যাহা কিনা লাল-মার্কা কমিউনিষ্টগণও কখনো ভাবিতে পারেন নাই।
আজ আফগানিস্তানে প্রতিদিন ন্যাটো বাহিনি নানাভাবে আফগান-যোদ্ধাদের হাতে নাজেহাল হইতেছে। এইটাও ওসামা বিন লাদেনের কৃতিত্ব। ইসলাম শান্তির ধর্ম। কিন্তু এই ধর্মে অন্যায়ভাবে আক্রমণকারীকে রুখিয়া দেবার কথাও বলা হইয়াছে। লাদেন সারা দুনিয়ায় মুসলামনগণের ভিতরে সেই চেতনা জাগ্রত করিবার কাজটিই করিয়াছেন।
ওসামা বিন লাদেনের চেতনার মৃত্যু নাই। এইটা য তাহার মৃত্যুর পরেও প্রমাণিত হইয়াছে। এই বিপ্লবীর জন্য সাড়ে তিন হাত জমিনও জুটিলো না তাহাকে সমুদ্রে নিক্ষেপ করা হইলো। উহা হইতেই বুঝিতে পারা যায় তিনি কতোটা শক্তিশালী। মৃত ব্যক্তিকে নিয়াও মার্কিন-গংদের কতোখানি ভয়।
ব্যক্তি ওসামা বিন লাদেনের মৃত্যু হইয়াছে। কিন্তু তিনি যে চেতনা ধারণ করিতেন তাহার মৃত্যু নাই। আগ্রাসী শক্তিকে আধিপত্যবাদী শক্তি তাহাদের প্রাপ্য হিসাব চুকাইয়া দিতে হইবেই। উহাই ইতিহাসের শিক্ষা। সেই শিক্ষা একেবারে বিফল হয় না। লিবিয়ায় যে ন্যাটো-বাহিনী ভূমিতে সৈন্য নামাইতেছে না--উহাও ওসামা বিন লাদেনের শিক্ষা। যে-শিক্ষাটা তিনি ন্যাটো বাহিনিকে আফগানিস্তানে দিয়াছেন।
ওসামা বিন লাদেনের প্রতি ভারতের আক্রোশের কথা আমরা জানি। কাশ্মীরের জনগণও জানেন। সমস্যা হইতেছে আমাদের দেশের প্রগতিশীলগণ মেহনিত মানুষের অধিকার-বিষয়ে কথা বলিলেও কাশ্মীরের জনগণের কথা বলিতে নারাজ।
ভালো থাকিবেন।
দেবব্রত মুখোপাধ্যায়০৩ মে ২০১১, ১৫:৪২
কোহিন ভাই,
‘ঘুরাইয়া প্যাচাইয়া’ নয়, একেবারে স্পষ্ট করে বলছি, বিন লাদেন একজন মার্কিন ‘দালাল’ ছিলেন/আছেন বলেই মনে করি।
বিন লাদেন মুসলিম বিশ্বের কোনো উপকার করেছিলেন বা তিনি মার্কিন বিরোধী ছিলেন; এমন আমার কখনোই মনে হয়নি। বরং আগেও যা বলেছি, তার কর্মকান্ডে যদি কেউ ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে থাকে তো সেটা মার্কিন প্রশাসন নয়, মুসলিমরা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন।
লাদেনের ইচ্ছায় (যদি আদৌ লাদেনের নিজস্ব ইচ্ছা বলে কিছু থেকে থাকে) যখন যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা মার্কিন প্রশাসনকে উপকৃত করেছে। কয়েকটা উদাহরন আগেই দিয়েছি। সোজা কথায় লাদেনের প্রতিটি হামলার জবাবে মার্কিনিরা মুসলিমদের আরও বেশি ‘জঙ্গী’ বলে চিহ্নিত করে অবমাননা বাড়িয়ে দিয়েছে। এবং হামলার উত্তরে আরও বেশি হামলা করে প্রান কেড়ে নিয়েছে এবং আরও বেশি জায়গা নিজেদের দখলে নিয়েছে।
একটু হিসেব করে বলুন তো বিন লাদেনের, তথা আল কায়েদার আক্রমনে এ পর্যন্ত মোট কতোজন খ্রিস্টান বা ইহুদি মারা গেছে? দেখতে পাবেন আল কায়েদার হামলায় নিহত মুসলিমের সংখ্যা তার চেয়ে ঢের বেশি।
আজকের দিনে সশস্ত্র পদক্ষেপ আদৌ কোনো ‘বিপ্লব’ করতে পারে বলে আমি মনে করি না। বিন লাদেনের পরিবর্তে কোনো ‘লাল-বাহিনী’ও এমন কাজ করে বেড়ালে তাকে আমি সমর্থন করতাম না।
আজকের দিনে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের একমাত্র জবাব হতে পারে নিজেদেরকে টেকনোলজি, জ্ঞানে, কৌশলে তাদের সমকক্ষ করে তোলা। যেটা চীন-ভারত করছে। বিন লাদেনের আদৌ মার্কিন বিরোধিতার উদ্দেশ্য থাকলে তিনি অস্ত্রের চেয়ে কলমের দিকে বেশি জোর দিতেন বলেই আমার বিশ্বাস। তার সেই অর্থের জোগানও ছিল।
সর্বোপরি, আপনি লিবিয়া ও আফগানিস্তানের প্রতিরোধের পেছনে বিন লাদেনের উপস্থিতি দেখতে পেয়েছেন; আমি পাচ্ছি না। লিবিয়ার প্রতিরোধ একেবারেই ভিন্ন চেহারার একটা ব্যাপার। তাদের সঙ্গে মতাদর্শিক ভাবে আল কায়েদার সম্পর্ক থাকতে পারে না।
আর আফগানিস্তানেও প্রতিরোধের মূল অংশ আল কায়েদা করছে না; সেই প্রতিরোধ করছে বিভিন্ন আফগান যোদ্ধা জাতিগোষ্ঠী। এইসব জাতিগোষ্ঠী কখনোই বিন লাদেনের অনুসারী ছিল না। কখনোই তারা আল কায়েদাকে একটি আফগান শক্তি বলে মনে করেনি।
সর্বশেষ, ইসরায়েলি আর মার্কিন অস্ত্র দিয়ে মার্কিন প্রতিরোধ হয় না রে ভাই। ওতে শুধু মার্কিন-ইহুদি অস্ত্র ব্যবসায়ীদের ব্যাংক ব্যালান্স বাড়ানো যায়।
যাই হোক, এগুলো আমার মত। আপনাকে একমত হতে হবে, এমন কথা নেই।
তবে আমার একটা অনুরোধ, আমার নাম দেখে আর কথাবার্তা শুনে আমাকে বাজারচলতি প্রগতিশীল বলে চালিয়ে দেবেন না। আমি ব্যক্তিগতভাবে শুধু কাশ্মীর ইস্যুতে নয়, বহুবিধ ইস্যুতে মারাত্মক ভারতবিরোধী। একইসঙ্গে পাকিস্তানের প্রতিও আমার বিরোধ কম নয়।
তবে মজা হল, আমি রাষ্ট্র হিসেবে ভারত-পাকিস্তান-যুক্তরাষ্ট্র; অনেকের বিরোধী। কিন্তু কোনো ভারতীয়, পাকিস্তানী বা মার্কিনি মানুষের প্রতি আমার ঘৃনা নেই।
পৃথিবীর কোনো মানুষের প্রতি আমার ঘৃনা নেই।
সবশেষে সুন্দর আলোচনার জন্য কোহিন ভাইকে অশেষ ধন্যবাদ।
কোহিন০৩ মে ২০১১, ১৬:৫৯
বাবু দেবব্রত মুখার্জি
১.''‘ঘুরাইয়া প্যাচাইয়া’ নয়, একেবারে স্পষ্ট করে বলছি, বিন লাদেন একজন মার্কিন ‘দালাল’ ছিলেন/আছেন বলেই মনে করি।''
@ নিজের রচনাটি আবারও পাঠ করিয়া দেখুন। তাহাছাড়া একটি হত্যকাণ্ডকে আপনি সাধারণ ''মৃত্যু'' শব্দ দিয়াই জাহির করিলেন!!

২. বিন লাদেন মুসলিম বিশ্বের কোনো উপকার করেছিলেন বা তিনি মার্কিন বিরোধী ছিলেন; এমন আমার কখনোই মনে হয়নি। বরং আগেও যা বলেছি, তার কর্মকান্ডে যদি কেউ ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে থাকে তো সেটা মার্কিন প্রশাসন নয়, মুসলিমরা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন।
@ আপনার মতন এইরকম মুসলিম-দরদি থাকিলে মুসলমানগণের বিপদের শেষ থাকিবে না।
হাজার বছরের বসতভিটা হইতে ফিলিস্তিনি জনগণকে যখন উচ্ছেদ করা হইয়াছিলো তখন তো তাহারা সেইভাবে অস্ত্র হাতে নেয় নাই। একটা সময় ছিলো যখন কথায়-কথায় ইসরাইলি সৈন্যরা লেবানন সীমান্ত অতিক্রম করিয়া হত্যাযজ্ঞা ঘটাইতো। ২০০৬ সালে হিজবুল্লাহ-র হাতে চরম মার খাইবার পর হইতে ইসরাইল এখন লেবানেন একটি ঢিল ছুড়িতেও ভয় পায়। উহার কারণ হিজবুল্লাহ-র হাতে অস্ত্র নেওয়া। মার্কিন-ইসরাইলিরা হিজবুল্লাহকে সন্ত্রাসী সংগঠন মনে করিয়া থাকে। তাহাতে কী হইয়াছে? মারইকন-প্রভু কি বলিবে না বলিবে এইটা চিন্তা করিয়া সশস্ত্র সংগ্রাম বন্ধ রাখিতে হইবে?
৩. লাদেনের ইচ্ছায় (যদি আদৌ লাদেনের নিজস্ব ইচ্ছা বলে কিছু থেকে থাকে) যখন যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা মার্কিন প্রশাসনকে উপকৃত করেছে। ... দেখতে পাবেন আল কায়েদার হামলায় নিহত মুসলিমের সংখ্যা তার চেয়ে ঢের বেশি।
@ সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে মারইকন প্রশাসনের বিলিয়ন-বিলিয়ন খরচ হইতেছে। তাহার পরেও বলিবেন ওসামা বিন লাদেন মার্কিনীদের উপকার করিয়াছেন? ইরাকে, আফগানিস্তানে--ন্যাটো বাহিনীর নিহত সৈন্যগণের সংখ্যা আপনিই হিসাব করিয়া দেখুন। আর বসিয়া বসিয়া মার খাইলেই যদি ভালো হইতো তাহা হইলে তো আমাদের মুক্তিযুদ্ধ করিবার প্রয়োজন থাকিতো না। ১৯৭১ সালের ৩০ লক্ষ মানুষের নিহত হইবার জন্য তাহা হইলে শেখ মুজিবুর রহমানকেই দায়ী করিতে হয়!!!! প্রতিরোধ যুদ্ধ না করিলে পাকিস্তানীরা অল্পেই শান্ত হইয়া যাইতো?

৪.আজকের দিনে সশস্ত্র পদক্ষেপ আদৌ কোনো ‘বিপ্লব’ করতে পারে বলে আমি মনে করি না। বিন লাদেনের পরিবর্তে কোনো ‘লাল-বাহিনী’ও এমন কাজ করে বেড়ালে তাকে আমি সমর্থন করতাম না।
@ প্রতিরোধের কোনো আজ-কাল নাই। স্পার্টাকাস সেই কবে প্রতিরোধ করিয়াছিলেন। সফল হইতে পারেন নাই ঠিকই কিন্তু মানুষের ভেতর প্রতিরোধের শক্তিটা যোগাইতে পারিয়াছেন। এইটা কম নহে।

৫. লিবিয়ার প্রতিরোধ একেবারেই ভিন্ন চেহারার একটা ব্যাপার। তাদের সঙ্গে মতাদর্শিক ভাবে আল কায়েদার সম্পর্ক থাকতে পারে না।
@ লিবিয়ার যুদ্ধটা ভিন্ন সেইটা মানি। কিন্তু সাদ্দামকে উৎখাত করিবার জন্য মার্কিন-ব্রিটিশ সৈন্য যেইভাবে ভূমিতে নামিয়াছিলো--এখন সেই ঝুকি নিতে পারিতেছে না--উহাই আমার বলিবার কথা। কারণ ইরাকে, আফগানিস্তানে তাহার যাহা হারাইয়াছে তাহার ধকলই এখন সামলাইতে পারিতেছে না।

৬.আর আফগানিস্তানেও প্রতিরোধের মূল অংশ আল কায়েদা করছে না; সেই প্রতিরোধ করছে বিভিন্ন আফগান যোদ্ধা জাতিগোষ্ঠী। এইসব জাতিগোষ্ঠী কখনোই বিন লাদেনের অনুসারী ছিল না। কখনোই তারা আল কায়েদাকে একটি আফগান শক্তি বলে মনে করেনি।
@ আফগানিস্তানের সাম্প্রতিক ইতিহাস বিষয়ে আপনার জ্ঞানের বহর দেখিয়া আমি সত্যসত্যই আফশোশ করিতেছি কেন এইরকম একটা মূর্খ মানুষের সহিত তর্ক করিতে যাইতেছি। কতো সালে আফগানিস্তানে মারইকন-ব্রিটিশ জোট হামলা শুরু করিয়াছে? কেন করিয়াছে? সেইখানে তখন কাহারা ক্ষমতায় ছিলো?

৭. ইসরায়েলি আর মার্কিন অস্ত্র দিয়ে মার্কিন প্রতিরোধ হয় না রে ভাই। ওতে শুধু মার্কিন-ইহুদি অস্ত্র ব্যবসায়ীদের ব্যাংক ব্যালান্স বাড়ানো যায়।
@ অস্ত্রের কোনো দেশ নাই ধর্ম নাই। কিন্তু দেখিতে হইবে সেই অস্ত্র কাহারা ব্যবহার করিতেছে? কি কাজে ব্যবহার করিতেছে? ওসামা বিন লাদেন মারইকন বিমান দিয়া যেইভাবে মারইকন-ভূখন্ডে হামলা চালাইয়াছিলেন--তাহা মার্কিনদের অহংকারের মুখে একটি বিশাল চপেটাঘাত। উহার একটি ঐতিহাসিক মূল্য রহিয়াছে।
দেবব্রত মুখোপাধ্যায়০৩ মে ২০১১, ২২:২৬
কোহিন ভাই,
মূর্খ বলে আমাকে ঘোষনাই করে দিয়েছেন। ভেবেছিলাম, আলাপ বাড়িয়ে আপনার আফসোস আর বাড়াবো না। পরে মনে হল, আপনি তো সত্যিটা টের পেয়েই গেছেন; এখন আলাপ বন্ধ করলে বাকীরাও টের পেয়ে যাবে-আমি একটা মূর্খ বই কিছু নই। তাই আরেকটু জবাব দেওয়ার চেষ্টা করছি।
আপনার মতোই পয়েন্ট ধরে ধরে বলি?

১। আমি হত্যাকান্ড বলি আর নাই বলি, এটি হত্যাকান্ড; তাতে সন্দেহ নেই। তবে এখন সন্দেহ বিন লাদেন কি আদৌ মারা গেছেন? বা মারা গেলে কি এ দিনই মারা গেলেন!!!

২। ‘‘আপনার মতন এইরকম মুসলিম-দরদি থাকিলে মুসলমানগণের বিপদের শেষ থাকিবে না।’’
এই কথাটা খানিকটা ব্যক্তিগত আক্রমন হয়ে গেল। এবং এই পয়েন্টে আপনি যে আলোচনা করেছেন, সেটা আমার ঠিক মনে হয়নি। প্রভুদের অসন্তোষের ভয়ে নয়, আমি মনে করি নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমানের জন্যই সহিংস পথ বন্ধ করা উচিত। আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস সহিংস সংগ্রাম অর্থ, মেধা ও জীবন নাশ করে। এ ছাড়াও শত্রুকে দমনের অনেক উপায় আছে। অন্তত মেধা-মননে তার চেয়ে নিজেকে অগ্রগামী প্রমান করা।

৩। ‘‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে মারইকন প্রশাসনের বিলিয়ন-বিলিয়ন খরচ হইতেছে। তাহার পরেও বলিবেন ওসামা বিন লাদেন মার্কিনীদের উপকার করিয়াছেন?’’
হ্যা, বলিব। কারণ এই বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় মারকিনিদের জন্য ‘লাভজনক’ একটি ব্যাপার। এখানে আজকের দিনের কথা চলে আসে। আজকের দিনটা ঠিক ষাটের দশক নয়। এটা করপোরেট দুনিয়া। এখানে ব্যবসার চেয়ে বড় রাজনীতি আর কিছু নেই। এই যে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয়, এটা বুশ-ওবামাদের পকেট থেকে হয় না। হয় সারা দুনিয়া থেকে কেড়ে নেওয়া ডলার থেকে। আর এই ব্যয়টা হয় সামরিক খাতে। সামরিক খাতের এই ব্যয়টার সিংহভাগ যায় অস্ত্রব্যবসায়ীদের পকেটে। মার্কিন সরকারের কূটনীতি থেকে শুরু করে নির্বাচন; সবকিছুতে এখন প্রধান ভূমিকা রাখে এই অস্ত্র ব্যবসায়ীরা। তাদের সন্তুষ্ট রাখতে উভয় পক্ষে (লাদেনের এবং মারকিনিদের) এই বিপুল সামরিক ব্যয়ের চেয়ে ভালো পদক্ষেপ আর হয় না।

৪। ‘‘প্রতিরোধের কোনো আজ-কাল নাই।’’
মোটা দাগে না থাকলেও দিন বদলেছে, এটা মানতেই হবে। এখন লড়াইটা যতো না অস্ত্রের তার চেয়ে বেশি বাজার ও মেধার। আসল লড়াইটা ওখানে দিতে হবে। সোভিয়েত ইউনিয়ন যে ভুল করেছিল, সেই দিন আর নেই। অস্ত্র খাতে মারাত্মক বিনিয়োগ না করেও যে লড়াইয়ে মাঠ দখল করা যায় তার প্রমান চীন। আমি চীনের প্রতি কোনো ভক্তি থেকে কথা বলছি না। কিন্তু তারা একটি ক্ষেপনাস্ত্রও না ছুড়ে এশিয়া, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য; ক্ষেত্রবিশেষে ইউরোপ-আমেরিকার বাজারেও যে দখল নিয়েছে, তাতে নিশ্চয়ই কোনো সন্দেহ নেই। ফলে প্রবল ঘৃনা থাকা স্বত্ত্বেও চীনের বিপক্ষে টু শব্দটি করার সাহস কিন্তু ওবামা সাহেবরা পাচ্ছেন না।

৫। প্রায় সহমত পোষন করায় আলোচনা বাড়ালাম না।

৬। আফগানিস্তানের সাম্প্রতিক ইতিহাস না জানায় আপনি আমাকে মূর্খ বলে রায় দিলেন। মাথা পেতে নিলাম। কিন্তু ভাই, আপনি কি খেয়াল করেছেন, তালিবান আর আল কায়েদার মধ্যে সুক্ষ একটা পার্থক্য আছে। অন্যরা গুলিয়ে ফেলতে পারে, কিন্তু আপনার এ যাবৎ কালের ‘জিহাদী’ লেখা পড়ে আমি নিশ্চিত, আপনি এটা বোঝেন। আল কায়েদা আফগান প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন যে নয়, এটা ইতিহাসের দস্তাবেজ দিব্যি স্বাক্ষী দেয়। আর ক্ষমতায় কে ছিল, সেটা দিয়ে কি প্রমান করতে চাইছেন? তালিবান আর আল কায়েদাকে এক ধরে নিলেও এ কথা কি বলা যায় যে, তালিবানরা আফগান জনগনের সরকার ছিল!!!!
আমার এবং কিছু মূর্খ ঐতিহাসিকের কখনোই তা মনে হয়নি।

৭। ‘‘অস্ত্রের কোনো দেশ নাই ধর্ম নাই।’’
আছে। অবশ্যই আছে। অস্ত্রের বিনিময়ে টাকাটা কার পকেটে যাচ্ছে, সেটা অবশ্যই দেখতে হবে। আমি অস্ত্র কিনছি ‘বিপ্লব’ বা ‘জিহাদ’ করার জন্য। আর সেই অস্ত্র বেচে ফেপে উঠছে, আমারই শত্রু; এ কেমন বিবেচনা প্রসূত কাজ হল?

নোট:
আপনি আমার নাম লিখেছেন ‘বাবু দেবব্রত মুখার্জী’।
এমনিতে হয়তো এই নামে আমার রাগ করার কিছু ছিল না। কিন্তু ‘বাবু’ শব্দটি না থাকলে খুশি হই। আর মুখার্জী শব্দটি মুখোপাধ্যায়ের ইংরেজ রূপ; তাই যতোদূর সম্ভব ত্যাগ করে চলি। এগুলো উল্লেখ করে কি আমাকে ব্রাকেটবন্দী করতে চাইছেন। লাভ নেই।
আলোচনা করলে পুরোটা বিষয়ে থাকুন। ব্যক্তিগত খোচাখুচি কাম্য নয়।
দেবব্রত মুখোপাধ্যায়০৪ মে ২০১১, ০০:১৮
কোহিন ভাইয়ের উদ্দেশ্যে:
ওসামা বিন লাদেন যাকে ‘মিত্র’ বলে প্রকাশ্যেই ঘোষনা দিয়েছিলেন, সেই যুদ্ধবিরোধী সাংবাদিক রবার্ট ফিস্কের লেখা থেকে কয়েকটি পয়েন্ট তুলে দিলাম। অনুবাদ -কাজী শাহরিন হক, বিডিনিউজ।

• আমি এ মানুষটার (বিন লাদেন) সঙ্গে তিন বার সাক্ষাৎ করেছিলাম, তবে একটা প্রশ্নই তাকে জিজ্ঞেস করা বাকি রয়ে গেলো আমার- ইসলামের পতাকাতলে না গিয়ে যার যার জাতির পতাকা নিয়ে, মুসলিম ও খ্রিস্টানরা যে অভ্যূত্থানগুলোতে (মধ্যপ্রাচ্যে) একসঙ্গে লড়েছে, তার দল আল-কায়দার সদস্যরা যাদেরকে খুশি মনেই খুন করতে ভালোবাসতো, এ বছরের ওই গণঅভ্যূত্থানগুলো দেখার পর তিনি কী ভাবছেন?
• (যদি বিন লাদেনকে প্রকাশ্য বিচারের মুখোমুখি করা হতো) নিশ্চয়ই তিনি বলতেন আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসনের সময় সিআইএ'র সঙ্গে তার যোগাযোগের কথা, অথবা ইসলামাবাদে সৌদি আরবের গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান প্রিন্স তুর্কির সঙ্গে তার সৌহার্দ্যপূর্ণ বৈঠকের কথা।
• অন্যান্য মুসলিম গোষ্ঠীর সঙ্গে তার (বিন লাদেন) সম্পর্ক ছিলো খুবই ধোঁয়াশাচ্ছন্ন। আমি যখন আফগানিস্তানে তার সঙ্গে দেখা করি, তখন তালেবান বাহিনীকেও ভয় পেতেন তিনি। তার অনুসারীরা শিয়া মুসলমানদের বিপথগামী ও স্বৈরশাসকদের নাস্তিক বলে মনে করতো এবং ঘৃণা করতো। তিনি কখনোই হামাসের প্রশংসা করেননি ।
কোহিন০৫ মে ২০১১, ১৬:২৩
ভ্রাতা দেবব্রত মুখোপাধ্যায়
ওসামা বিন লাদেনকে যে হত্যা করা হইয়াছে---তাহা নিয়া মার্কিন প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিগণই একেক সময় একেকরকম কথা বলিতেছেন। কখনো বলা হইতেছে তিনি নিরস্ত্র ছিলেন। আবার বলা হইতেছে সশস্ত্র ছিলেন। একবার বলা হইতেছে তাহার মৃতদেহের ছবি প্রকাশ করা হইবে। আবার বলা হইতেছে শেষ পর্যন্ত ওবামা ছাহাব ঘোষণা দিয়াছেন সেইটি করা হইবে না। এইসব হইতেই বুঝিয়া লইতে পারি জীবিক ওসামা বিন লাদেন যেমন মার্কিনীদের ভয়ের কারণ ছিলেন তিনি তাহার মৃত্যুর পরেও সমান শক্তিশালী। ওসামা বিন লাদেন কবে মারা যাইবেন সেইটাও কি আপনার-আমার মর্জি অনুযায়ী হইবে?
আপনি ভিন্নধর্মের বলিয়া আপনাকে মুসলিম-দরদী বলি নাই। এইরকম বিষয় অনেক মুসলামনদের মধ্যেও দেখা যায়। যেমন হামাসকেও কেহ-কেহ একবার সন্ত্রাসী আরেকবার মার্কিন-ইসরাইলের দালাল বলিয়া প্রচারণা চালানো হইয়া থাকে।
উহার কারণ হইতেছে ভীত মানুষের মনস্ততত্ব। একটু ব্যাখ্যা করিতে দিন।
মুখে আমার সকলেই সাহসী। কিন্তু তাহা প্রমাণ হয় কাজের বেলায়। কোনো প্রতিবাদে প্রতিরোধের বেলায় ভীত মানুষ বেশি বিপদে পড়িয়া যায়। কেননা তখন বিষয়টা প্রমাণসাপেক্ষ হইয়া দাড়ায়। দেখিবেন একজন ভীতু মানুষও নিজেকে ভীতু বলিয়া স্বীকার করিতে নারাজ। কিন্তু প্রতিবাদ করিলেই তো ঝামেলা। কাজেই ১০ জনের ভিতর ১ জন প্রতিবাদ করিলে যখন ''ঝামেলা'' হয় তখন সবাই সেই প্রতিবাদকারীকেই উল্টা বকাবাকি করিয়া থাকে। কি দরকার ছিলো..খামোকা ঝামেলা বাধাইবার!!! এইসব বলা হয়। উহা ছোটো জায়গায়।
এইখানেও ঠিক তেমনি একটি ব্যাপার ঘটিয়াছে। আপনি ইতিহাসের কিতাব লইলেই দেখিবেন এইটা নতুন বিষয় নহে। শেখ মুজিব যখন ৬ দফা দিয়াছিলেন তখন এই দেশের রাজনৈিতক দলগুলি উহার জন্য ঠিক প্রস্তুত ছিলো না। নিজেদের এই ব্যর্থতা ঢাকিবার জন্য সেই সময় ৬ দফাকে সিআইয়ের দেওয়া নকশা বলিয়া প্রচার করা হইয়াছিলো। শুধু তাহাই নহে মেখ মুজিবকেও মার্কিন দালাল হিসেব প্রচার করা হইয়াছিলো।১৯৭১ সালের যুদ্ধের সময় অনেকেই '''ঝামেলা ''' বাধাইবার জন্য শেখ মুজিবকে দায়ী করিতে ছাড়েন নাই।
ওসামা বিন লাদেনের বেলাতেও ঠিক তাহাই ঘটিয়াছে।
বিলিয়ন-বলিয়ন অর্থ খরচ হইতেছে। আপনি তাহা স্বীকার করিয়াও পরে এড়াইয়া গিয়াছেন। ইরাক হইতে না হয় তৈল পাওয়া যাইতেছে কিন্তু আফগান্তান হইতে ন্যাটো কি পাইতেছে? নিহত সৈন্যদের সংখ্যা দিন-দিন বৃদ্ধি পাইতেছে। আপনার কি ধারণা সবই সাজানো নাটক?
তাহা হইলে বলিতে হয় : ভিয়েতনামের যুদ্ধও একটি সাজানো নাটক। বলিভিয়ায় নিহত চে-গুয়েভরাও মার্কিন দালাল।আফগানিস্তানে রুশ আক্রমণও সাজানো নাটক। ফিলিস্তিন সংগ্রামও তাহাই।
আর এই নাটকের বিরুদ্ধে মারইকন-ব্রিটিশ-জার্মানী-ফ্রান্স সকল দেশের নাগরিকগণ মুখ বুজিয়া তাহা মানিয়া লাইতেছে। এতোটা সহজ সমীকরণ নাই-বা করিলেন!!!
ভালো থাকিবেন।

ভ্রাতা দেবব্রত মুখোপাধ্যায়
এই দেশের উচ্চবর্ণের হিন্দুগণকে একসময় ''বাবু'' বলিয়াই সম্বোধন করিতে হইতো। পশ্চিমবঙ্গেও উহার নমুনা দেখিয়াছি। আপনি যখন বারণ করিলেন তখন আর করিবো না।
চিনাদের অস্ত্রসম্ভার নিয়া আপনি যাহা লিখিয়াছেন তাহার একটু জবাব দিতে হইতেছে।
আপনার জানা নাই (অথবা জানা থাকিলেও তাহা চাপিয়া গিয়াছেন) যে প্রতিরক্ষা ব্যয়ে চিনাদের স্থান ২ নম্বরে। প্রথমে রহিয়াছে মুরুব্বি মার্কিন!
আর অস্ত্র বেচাবিক্রয়তেই চিনাদের জায়গা ৭ নম্বরে। উহা দিন-দিন বৃদ্ধি পাইতেছে। এশিয়া ছাড়াইয়া চিনাদের অস্ত্র এখন আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকাতেও পহুছিয়াছে!!
@ রবার্ট ফিস্কের সাক্ষাৎকার পাঠ করিয়াছি। বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে তাহার সাক্ষাৎকার দেখিবার সৌভাগ্য অন্য আরো মানুষের মতন আমারও হইয়াছে। এখন শুধু এইটুকুই বলিবো ওসামা বিন লাদেনের হত্যাকন্ডের পর হামাসের বিবৃতিটাও নিশ্চয়ই পাঠ করিয়াছেন।



কোহিন ভাই, 
আপনার আলোচনা সবমিলিয়ে ভালো লেগেছে। 
তবে এখন আলোচনা যে পর্যায়ে গেছে, তাতে আমি আমার দেয়ালে, আপনি আপনার দেয়ালে। দু জনই পরস্পরের অবস্থান বুঝতে পারছি। এরপরও এই তর্ক টেনে নিয়ে যাওয়া মানে স্রেফ কাটাকাটির জন্য কথা বিনিময় করা হবে। 
আমার মনে হয়, আপাতত আলোচনাটা এখানে আমার দিক থেকে আমি বন্ধ করতে পারি। 
পরে অন্য কোনো ফোরামে বা অন্য কোনো বিষয়ে আরও আলোচনা হবে।

ক্রিকেট খেলা কেন দেখব!

স্যার ডন ব্রাডম্যান যে ক্রিকেট খেলতেন, নেভিল কার্ডাস যে ক্রিকেট নিয়ে লিখেছেন; সেই ক্রিকেট আর আজকের দিনের ক্রিকেট এক খেলা নয়। খেলাটির সঙ্গে যে রোমান্টিসিজম জড়িয়ে ছিল তা সম্ভবত চিরতরে দূরে চলে গেছে। বিশ্বজুড়ে ব্যাট-বলের মধুর সেই সঙ্গীতের জায়গাটা দখল করে নিয়েছে মোবাইল ফোনের কর্কশ আওয়াজ। লোভ আর হুমকি খেলাটিতে সম্পৃক্ত করেছে বিপুল অর্থ এবং নিয়ন্ত্রন চলে গেছে অন্ধকার জগতের হাতে।

ম্যাচ পাতানো বিষয়ক সিবিআই তদন্ত কমিটির (২০০০) রিপোর্টের উপসংহার




গত বছর চারেক ধরেই আমার মাথার ভেতর এই প্রশ্নটা ঘুরছিল-ক্রিকেট খেলা আর দেখব কেন? প্রশ্নটা আরেকটু উস্কে দিলেন হাসান তিলকরত্নে। শ্রীলঙ্কান কিছু খেলোয়াড়ের বাজিকরদের সঙ্গে যোসাজস নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই গুঞ্জন চলছিল। তিলকরত্নে জানালেন, ঘটনা সত্যি। আবার মনে হল, কেন নিজেকে এই প্রতারনার শিকার হতে দেব?
কেমন প্রতারণা? 
ধরুন কোনো একজন বোলারের বোলিং দেখে অভিভূত হয়ে গেলাম; দু দিন পর পত্রিকায় দেখলাম, ওই বোলিংটা করার পথে সে তিনটি ‘নো বল’ করেছে অর্থের বিনিময়ে। কোনো একটা টানটান উত্তেজনার ম্যাচ দেখে রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেল। শেষ ওভারে ১২ রান দরকার, শেষ বলে চার; শেষ পর্যন্ত জয়-পরাজয় নির্ধারিত হল ১ রানে। পরে জানা গেল; ম্যাচটা পাতানো ছিল।
এই পাতানোর খেলায় ক্রিকেটের কতোটা ক্ষতি করছে, সে বিবেচনায় না হয় নাই গেলাম। কিন্তু নিজেকে হাস্যকর এক পাতানো নাটকের নির্বোধ দর্শক হিসেবে ভাবতে আর ভালো লাগে না। আমি যা নিয়ে উত্তেজিত হই, যা দেখে রোমাঞ্চিত হই; পরে সে সবকিছুকে সাজানো নাটক বলে জানতে আর ভালো লাগে না। 
অথচ আমরা এই চক্রের মধ্যে পড়ে গেছি। আমরা এই সময়ে ক্রিকেট দর্শকরা নিতান্তই হাস্যকর ও নির্বোধ চরিত্রে পরিনত হয়েছি। তারা সবকিছু আগে থেকে ঠিক করে রাখবেন, আর আমরা সেই ঠিক করা খেলা দেখে মজা পাওয়ার চেষ্টা করব। শেষ পর্যন্ত ভূক্তভোগী আমরা এই দর্শকরা হলেও এর দায় নিশ্চয়ই আমাদের নয়। দায়টা অবশ্যই আইসিসি কর্তাদের, আরও ভালো করে বললে বলা যায়, দায়টা ভারত ভিত্তিক অসাধু কিছু রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীর; যারা এখন ক্রিকেটের দ-মুন্ডের কর্তা হয়ে দাড়িয়েছেন। 
ক্রিকেট এখন যে অন্ধকার জগতের অঙ্গুলি হেলনে পরিচালিত হয়, সেই জগতে ক্রিকেটের প্রবেশ শুরু হয়েছিল পরিস্কার ভাবে জগমোহন ডালমিয়ার হাত ধরে। ক্রিকেটের ‘গ্লোবালাইজেশনের’ নাম করে খেলাটায় আরও টাকা ও আরও লোভ টেনে এনেছিলেন এই ভদ্রলোক। আর এই কাচা টাকার ওপর বাজি ধরে, সেই বাজি নিজেদের মতো নিয়ন্ত্রন করার নেশায় ক্রিকেটে পঙ্গপালের মতো ছুটে এসেছিল অন্ধকার জগতের লোকেরা। 
তার ফলাফল আমরা ২০০০ সালের দিকে এসে দেখলাম। ক্রিকেটের ভদ্রজনোচিত ভাবমূর্তি ধ্বসেপড়ল। হ্যানসি ক্রনিয়ে, মোহাম্মদ আজহারউদ্দিন, সেলিম মালিক, ওয়াসিম আকরামের মতো সর্বজন শ্রদ্ধেয় ক্রিকেটারের অন্য এক জীবন বেরিয়ে এলো এই সময়ে। 
ডালমিয়া যে চক্র শুরু করেছেন, শরদ পাওয়ার সেই চক্রের আশ্রয়দাতা হয়ে উঠলেন। আর এই দুষ্টু চক্র পালনের শিল্পী হয়ে ক্রিকেটকে ‘থ্রি সি’ তে পরিনত করলেন লোলিত কুমার মোদী-ক্রিকেট, ক্রাইম, সিনেমা।
খেলোয়াড়রা কেন বাজিকরদের সঙ্গে হাত মেলান? এটা বুঝতে বাজিকরদের স্বার্থটা বুঝতে হবে। ক্রিকেটে বাজি উপমহাদেশে নিষিদ্ধ হলেও ইউরোপে আইনি ব্যাপার। উপমহাদেশে, বিশেষ করে ভারতে নিষেধাজ্ঞার বেড়াজাল টপকে দিব্যি চলে বাজির খেলা। তাতে খেলায় কোনো প্রভাব পড়ার কথা নয়। 
খেলার আগে খেলা সম্পর্কে অনুমান করে জুয়ার মতো টাকা লগ্নী করে কেউ লাভ করবে, কেউ লোকসান দেবে; এই তো? কিন্তু এখানেই বাজিকররা তাদের খেলটা দেখাতে শুরু করলেন। তারা ভাবলেন, খেলাটাকে যদি নিয়ন্ত্রন করা যায় তাহলে লাভ পুরোটাই নিজেদের ঘরে আসে। 
যে দলের পক্ষে বাজি বেশি পড়েছে, সেই দল যদি মাঠে হেরে যায়; তাহলে বাজিকররা ফেপে ফুলে ওঠে। সেটাই করা হল খেলোয়াড়দের হাত করে। ম্যাচে ফেবারিট দলকে হারার জন্য পয়সা দেওয়া শুরু হল। এটা অবশ্য পুরো গপ্প; সেই ক্রনিয়ের জামানার গপ্প। এখন দিন বদলেছে। 
এখন ম্যাচ নিয়ে সরাসরি বাজির চেয়ে বেশি লাভ স্পট ফিক্সিংয়ে। এখানে একটি একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে বাজি ধরা হয়। যেমন প্রশ্ন থাকে-দ্বিতীয় ইনিংসের প্রথম বলে কি হবে। চারটি উত্তর হয়তো থাকল-১. চার রান, ২. কোনো রান নয়, ৩, আউট, ৪. পাচ রান (ওয়াইড চার)। 
মানে একটি দৃশ্যত অসম্ভব অপশন থাকবে। এই অপশনে বাজি ধরার মতো ‘পাগল’ তো খুজে পাওয়া কঠিন হবে। এখন বাজিকররা সংশ্লিষ্ট খেলোয়াড়দের সঙ্গে চুক্তি করে দৃশ্যত অসম্ভব ওই কাজটিই করাবেন। ফলে বাকি তিন অপশনে গন হারে যে বাজি ধরা হয়েছিল, সবার ভরাডুবি; সবার টাকা যাবে বাজিকরদের পকেটে। 
এই ধরণের অভিযোগেই অভিযুক্ত হয়ে নিষিদ্ধ আপাতত পাচ পাকিস্তানী ক্রিকেটার। পাকিস্তানী চার জন্য তো নিষিদ্ধ। তাহলে বলতে পারেন, ক্রিকেটের ওপর ভক্তি কেন উঠে গেছে? বাকিরা তো ঠিক আছে। 
এখানেই তো ভেজালটা। ময়লা সব মাছে খাচ্ছে, দোষ শুধু বেলে মাছের। রাজনৈতিক পরিস্থিতি বা নিজেদের অশিক্ষা; যে কোনো কারণেই হোক, কোনো একটা অভিযোগ উঠলেই পাকিস্তানীদের শাস্তি পেয়ে যেতে আর সময় লাগে না। কিন্তু অভিযোগ তো আরও উঠছে। 
ভারতের পিয়ুস চাওলার বিপক্ষে পরিস্কার গড়াপেটার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠল; আইসিসি তদন্তাটও করল না। সাঙ্গাকারার বিপক্ষে বিশ্বকাপের আগেই অভিযোগ উঠল এক রেস্টুরেন্টে বাজিকরদের সঙ্গে মিটিং করার; ক্রিকেটের এই বিবেককে নিয়ে কোনো তদন্ত হল না। ইংল্যান্ডের ঘরোয়া ক্রিকেটে একের পর এক অভিযোগ; বলার মতো কোনো শাস্তি বা ফাইন্ডিংস নেই আইসিসি বা ইসিবির। 
সর্বশেষ বিশ্বকাপ ফাইনাল নিয়ে গুঞ্জন-শ্রীলঙ্কা কেন বিনা কারণে পরীক্ষিত পারফরামদের রেখে মাঠে নামল? অনেক প্রশ্ন উত্তর দেওয়ার কেউ নেই। কে উত্তর দেবে? যেই রাম, সেই রাবন। যেই ভারতীয় কর্মকর্তা, সেই আইসিসি। কে কাকে নিয়ে তদন্ত করবে!
তাহলে কি ধরে নেব, সিবিআইয়ের ওই রিপোর্টই শেষ কথা? ক্রিকেট তাহলে পুরোটাই অন্ধকার জগতের নিয়ন্ত্রনে চলে গেছে?
এক বড় ভাই, একটি শীর্ষস্থানীয় দৈনিকের ক্রীড়া সম্পাদক আমার হতাশা শুনে বললেন, ‘কি সব বলো! আইসিসির সদর দপ্তর যেদিন লন্ডন থেকে দুবাই চলে এলো, সেদিনই তো খেলাটা অন্ধকার জগতে আনুষ্ঠানিক ভাবে চলে গেছে। দুবাইতে অফিস করে কারা?’
কারা?
‘ভারত-পাকিস্তানের মাফিয়ারা। যাদের ওখানে অন্তত পুলিশ ধরতে পারে না। এ যেন নো ম্যানস ল্যান্ড।’
তাহলে আর ক্রিকেট দেখব না!
‘অবশ্যই দেখব। বলিউডের সিনেমা দেখি, হলিউডের সিনেমা দেখি; সে তো অভিনয় জেনেই দেখি। ক্রিকেটও এখন থেকে অভিনয় জেনেই দেখব।’

ভাষা নিয়ে ভাসা-ভাসা কথা

লেখাটি রস আলোতে ছাপা হইয়াছিল। যারা পড়েছেন, মনে মনে (বা প্রকাশ্যে) গালি দিন। যারা পড়েননি, তারাও পড়ে গালি দিতে পারেন। 

‘অনেক কথা যাও যে বলে, কোন কথা না বলি। তোমার ভাষা বোঝার আশা দিয়েছি জলাঞ্জলি।’
আমি কিছু বলছি না। তবে আপনি ইচ্ছা করলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই কথার অন্য রকম মানে করতে পারেন। ভাবতে পারেন, রবি ঠাকুরেরও একই সমস্যা ছিল। সমস্যা আর কী? সেই ভাসা-ভাসা ভাষাজ্ঞান নিয়ে চলে আসা সমস্যা (রবীন্দ্রনাথের নাম করতেই কেমন মিল চলে এসেছে, এখন শুধু ছন্দটা এলেই হয়)।
ভাষা নিয়ে যাতনা এমন পর্যায়ে গেছে যে এখন চোখের জলেও কাজ হচ্ছে না। আমাদের মতো নিতান্ত বকলমদের কথা বাদ দিন। টেলিভিশনে খেলোয়াড়দের চোখের জল-নাকের জল দেখেও কী বুঝতে পারেন না বেদনাটা আসলে কোথায়?
ইংরেজি বলতে হবে, এ ভয়েই নাকি আমাদের ক্রিকেটাররা ম্যাচ-ট্যাচ জিতছেন না। এমনকি নিন্দুকেরা বলছেন, অনেকেই নাকি এই ভয়ে ইচ্ছা করে আউট-টাউটও হয়ে যাচ্ছেন (দেখেন ভাই, এর মধ্যে আবার যোগ্যতা-ফোগ্যতার প্রশ্ন টেনে আনবেন না)।
পাছে ম্যান অব দ্য ম্যাচ হয়ে আবার ইংরেজিতে সাক্ষাৎকার দিতে হয়!
আমাদের ক্রিকেটারদের কথা আর কী বলি! পাকিস্তান দলের সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিল, তারা আর ইংরেজিতে কথাই বলবে না। এটা পাকিস্তানিদের খুব মাতৃভাষাপ্রীতি ভেবে যাঁরা আবেগে চোখের জল ফেলছিলেন, তাঁরা একটু আসল সত্যটা তলিয়ে দেখুন। আরে ভাই, ইংরেজি বলতে গেলে পারতে তো হবে। তারা এখানে আমাদের লাইনেই দাঁড়ানো।
পাকিস্তানি খেলোয়াড়দের মধ্যে ইংরেজি বলার জন্য সবচেয়ে ‘খ্যাত’ ইনজামাম-উল হক (অধুনা সাবেক)। এক ‘ইনশাল্লাহ’ ছাড়া ইংরেজিতে আর কোনো শব্দই সহজে আসে না তাঁর। ইনজামামের ইংরেজি নিয়ে গল্পের অভাব নেই। একবার রমিজ রাজা নাকি সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে ইনজিকে জিজ্ঞেস করেছেন, ‘আমাদের দলটাকে তুমি লড়াকু একটা মেশিনে পরিণত করলে কী করে? দেখলে মনে হয় ক্ষুধার্ত (হাংরি) বাঘ।’ ইনজি যথারীতি হেসে উত্তর দিলেন, ‘না, আমরা তো ক্ষুধার্ত না। আমাদের এখন অনেক টাকা আর সব সময় হালাল মাংস খাই’!
ইনজামামকে নিয়ে এ যাবৎকালের সেরা ঘটনাটা বলা একটু ঝুঁকিপূর্ণ। আপনারা অনুমতি দিলে বলেই ফেলি। ম্যাচ শেষে ইনজামামকে সাংবাদিক কী জিজ্ঞেস করতে পারেন, তা অনুমান করে উত্তর নাকি তৈরিই রাখতেন। প্রথম প্রশ্ন যাই হোক ইনজামাম ওই মুখস্থ কটা লাইন বলবেন।
সমস্যাটা হলো সেদিন ম্যাচ শেষে টনি গ্রেগ নাকি প্রথম প্রশ্নটা করেছিলেন, ‘ইনজি, তোমার স্ত্রীর তো বাচ্চা হবে। তুমি নিশ্চয়ই খুব খুশি?’ তৈরি থাকা ওই উত্তরটাই শুনিয়ে দিলেন ইনজামাম, ‘এ কৃতিত্ব আমার একার নয়। দলের সবাইকে এ জন্য আমি ধন্যবাদ জানাই। সবাই যার যার মতো ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ ধন্যবাদ আফ্রিদীকে। সে ছাড়া এটা সম্ভব হতো না। ওদিকে বব উলমারও পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছিলেন এবং নির্দেশ দিচ্ছিলেন। আশা করি ভবিষ্যতেও আমরা এ রকম ফল আনতে পারব।’
বুঝতে না পেরে উল্টাপাল্টা করে ফেলার ব্যাপারটার বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের বেলায়ও অভাব নেই। জাতীয় দলের এক ক্রিকেটার ইংল্যান্ডে গেছেন জুতা কিনতে (আসলে ক্রিকেট খেলতে গিয়েছিলেন)।
দোকানে ঢুকেই দোকানিকে বললেন, ‘ক্যান আই হেল্প ইউ?’ দোকানি তো বুঝে পায় না, তার আবার কী সাহায্য লাগতে পারে। বেচারা যখন হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে, তখন পাশ থেকে এক সিনিয়র ক্রিকেটার বললেন, ‘ওই ব্যাটা। বল্, ক্যান ইউ হেল্প মি?’
দোকানির প্রশ্ন যখন উঠল, আরেকটা দোকান সংক্রান্ত ঘটনা শোনা যাক। ‘এ’ দলের সঙ্গে পাকিস্তান সফরে গেছেন জহুরুল ইসলাম অমি। বড় নোট ভাঙাতে হবে। তিনি প্রথমে ইংরেজিতেই বলেছিলেন ‘চেঞ্জ’ দিতে। দোকানি তো বোঝে না। ওই যে, ইনজামামের ভাই তো। শেষ পর্যন্ত অমি ভাবলেন, উর্দুজ্ঞানটাই কাজে লাগানো যাক, ‘ভাই, এ নোট কো চুরমার কর দো!’ চুরমার করা মানে তো ভেঙেই ফেলা, তাই না?
তার পরও ‘সর্বস্তরে বাংলা ব্যবহার’ মানতে পারছেন না? তাহলে ডেভ হোয়াটমোরের একটি গল্প শুনে নিন। প্রথম আলো-গ্রামীণফোন বর্ষসেরা ক্রীড়া পুরস্কার দেওয়া হবে। রিপোর্টিংয়ের সঙ্গে দাওয়াত কার্ডও নিয়ে বের হয়েছি। তৎকালীন কোচ ডেভের সামনেই সবাইকে কার্ড দিলাম। ভাবলাম, এদের দিলাম, কোচকে দেব না! বেচারা রাগ করবেন না? শেষ পর্যন্ত একটি কার্ডের ওপর ইংরেজিতে নাম ঠিকুজি লিখে বাড়িয়ে দিলাম। ভেতরে বাংলায় লেখা দাওয়াত পড়তে পারবেন কি না, ভেবে একটু ভয়ে ছিলাম।
কার্ড দেখেই ডেভ ‘নো, নো’ করা শুরু করলেন। ব্যাপার কী? বলেন, ‘আমি খুব ব্যস্ত, কোনো দাওয়াত রাখতে পারব না।’ কোনোক্রমে ভেঙেচুরে বললাম, ‘বাবা, ভেতরে খুলে দেখো।’ বলছি আর ভাবছি, ভেতরের বাংলা দেখে আরও চটবেন। ও হরি! কার্ড খুলেই হেসে উঠলেন। বলেন কিনা, ‘ও আচ্ছা! উটপল আমাকে বলেছে। পোরোঠোম আলো?’
আমি তো আমি, ক্রিকেটাররাও সবাই অবাক, ‘ব্যাটা বুঝল কী করে?’ জিজ্ঞেস করতেই একগাল হেসে প্রথম আলোর লোগোটা দেখিয়ে দিলেন। বললেন, ‘এটা পড়তে পারি।’ এবার বিশ্বাস হয়েছে, মাতৃভাষাই শ্রেয়?

সোশ্যাল নেটওয়ার্ক

Twitter Delicious Facebook Digg Stumbleupon Favorites