একটি ট্রেন লাইনের মৃত্যু

আমাদের একটা ট্রেন ছিল। অনেক দিন আগেই সে মারা গেছে; মেরে ফেলা হয়েছে! এই সেদিন পত্রিকান্তরে জানা গেল, শেষকৃত্য হয়ে গেছে আমাদের সেই ছোট্ট, শান্ত ট্রেনলাইনটার। হবে না কেন? আর কত কাল এই বোঝা বইবে সরকার? শেষ পর্যন্ত নিলামটিলাম করে কাদের যেন দায়িত্ব দিয়ে দেওয়া হয়েছিল, রূপসা-বাগেরহাট রেললাইনটা খুঁচিয়ে তুলে ফেলার।

একজন সিদ্দিকুর এবং যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস

তারিখটা মনে নেই। রেডিসন হোটেলের ঘটনা। মঞ্চে বসে আছেন তিন বাহিনীর প্রধান। তাদের পাশে একটু সংকুচিত হয়ে বসে আছেন কালো একটি ছেলে; ছেলেটির মুখ থেকে দীপ্তি ঠিকরে বের হচ্ছে। সেনাপ্রধান বক্তৃতা দিতে উঠলেন। দর্শকসারিতে চেয়ে বললেন, ‘এখানে কি সিদ্দিকের মা আছেন?’

কোচ সমাচার

‘কোচ দুই ধরনের। এক দল বরখাস্ত হয়েছে। আরেক দল বরখাস্ত হওয়ার অপেক্ষায় আছে।’ কথাটা নিশ্চয়ই এর মধ্যে কয়েক হাজার বার শুনে ফেলেছেন। শুনুন বা না-ই শুনুন, কোথাও কোনো কোচ বরখাস্ত হলে পত্রিকায় তো পড়েছেন নিশ্চয়ই? কিন্তু কোচরা এমন ঘন ঘন ছাঁটাই হন কেন?

প্রফেসর ইউনুস ও দুর্নীতি এবং আমাদের ভাবমূর্তি

শেখ হাসিনা মধ্যবিত্ত ঝগড়াটে মহিলার মতো আচরণ করে ইউনুস সাহেবের সত্যিকারের কোনো ক্ষতি করতে পারেননি। আর্থিক ও জনপ্রিয়তার বিচারে ইউনুস সাহেবের লাভই হয়েছে।

এক খামখেয়ালি বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন

তিনি বেস্টের মতো খামখেয়ালি, মোৎজার্টের মতো শিল্পী, হিটলারের মতো ইহুদিবিদ্বেষী-নারীবিদ্বেষী এবং আলীর মতো চ্যাম্পিয়ন। তিনি রবার্ট জেমস ফিশার বা ববি ফিশার, দাবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন! নিয়মতান্ত্রিক এই দুনিয়ার প্রতি অনিয়মের এক প্রবল পরিহাস।

প্রকাশিত লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
প্রকাশিত লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

মঙ্গলবার, ৫ জুলাই, ২০১১

আরেক জন




বুকে চাপা একটা ব্যথা। নিঃশ্বাস নিতেও যেন কষ্ট হচ্ছে। ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসল সাজিদ, সাজিদ হায়দার। দেয়ালে হেলান দিয়ে বড় বড় করে নিশ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করল। দর দর করে ঘামছে। হাত বাড়িয়ে টেবিল থেকে পানির বোতল টেনে নিল। পর পর দু ঢোক পানি খেয়ে একটু সম্বিত ফিরে পেল। বুঝতে পারল, মরে যাচ্ছে না। আবার সেই স্বপ্নটা দেখেছে।
স্বপ্নটা এমন মারাত্মক কিছু না। ঘটনা শুরু হয় বাংলাদেশ-পাকিস্তান ম্যাচের ঠিক আগে। বাংলাদেশ দলের বাহাতি ওপেনার সাজিদ স্বপ্নে দেখে, ড্রেসিংরুমে পৌছাতে তার দেরী হয়ে যাচ্ছে। তাড়াহুড়ো করে ড্রেসিংরুমের এলাকায়, মানে জোন-ওয়ানে ঢোকার মুখে তাকে আটকে দেয় এক সিকিউরিটির লোক।
ওই লোকটার চেহারা রোজ বদলে যায়। সিকিউরিটির লোকটাকে কোনোদিন বোর্ড প্রেসিডেন্টের মতো দেখা যায়, কোনো দিন কোচ জেমি সিডন্সের মতো। সিকিউরিটির লোকটাকে সাজিদ কিছুতেই বোঝাতে পারে না, সে বাংলাদেশ দলের ওপেনার। তাকে ছাড়া এই খেলা শুরু হতে পারে না।
রোজই সিকিউরিটির লোকটা এই পর্যায়ে হেসে দেয়। ড্রাকুলার মতো মুখ করে সে প্রত্যেক দিন বলে, ‘কে বলে, খেলা শুরু হবে না! ওই দ্যাখেন...’
লোকটার আঙুল অনুসরণ করে সাজিদ তাকায় ড্রেসিংরুমের বিশাল টেলিভিশনে। দেখতে পায় শুরু হয়ে গেছে বাংলাদেশ-পাকিস্তান ম্যাচ। তার চেয়েও তাজ্জব ব্যাপার, বাংলাদেশ দল ব্যাটিংই বেছে নিয়েছে টসে জিতে। তাহলে সাজিদের বদলে ব্যাট করছে কে?
ঠিক এই সময় প্রতিদিন টেলিভিশনে দুই ওপেনারের মুখ দেখা যায়। সাজিদের দিকে চেয়ে হেলমেটের ফাক থেকে মৃদু মৃদু হাসে সাজিদ। বুকে চাপা একটা ব্যাথা শুরু হয়, ঘুম ভেঙে যায় সাজিদের।
আর দশ জন লোক এই স্বপ্ন দেখলে হয়তো মোটেও আতঙ্কিত হতেন না। কিন্তু সাজিদ কেন যেন খুবই ভয় পাচ্ছে এই স্বপ্ন দেখেÑরোজ কেন সে এই একই স্বপ্ন দেখছে। আমি-আপনি হলে এই ভয় পাওয়ায়ও কিচ্ছু আসতো যেত না। কিন্তু সাজিদ তো জাতীয় দলের ক্রিকেটার। তার ভয় পাওয়ায় অনেক কিছু যায় আসে।
সাজিদকে অবশ্য ঠিক জাতীয় দলের খেলোয়াড় বলা যাবে না। তার এখনও অভিষেক হয়নি। অভিষেকটা হবে পাকিস্তানের বিপক্ষে। আগামী সপ্তাহে ম্যাচ। পনেরো সদস্যের দলে ডাক পেয়েছে সে। এবারের লিগে সাজিদের যে রান আর জাতীয় দলের দুই ওপেনারের যে ফর্ম; তাতে সাজিদের অভিষেকটা এখন সময়ের ব্যাপার।
কিন্তু এই স্বপ্নটা শুরু হওয়ার পর থেকে ব্যাপারটার আর এতো নিশ্চিত নেই। রাতের স্বপ্নে দেখা এই ভয়টা সারাদিন সাজিদের সঙ্গে থাকে। নেটে ব্যাটিংয়ের সময়ও পিছু ছাড়ে না। ফলে লিগের সেই সাজিদকে গত তিন-চার দিন ধরে নেটে ঠিক পাওয়া যাচ্ছে না।
এমনকি এই সেদিন ‘এ’ দলের বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচেও মাত্র ২৭ রান করেই বোল্ড হয়ে ফিরে এসেছে সাজিদ। ওই পর্যন্ত স্বচ্ছন্দে ব্যাট করছিল। তারপরই স্বপ্নটার কথা মনে পড়ে গেল। অফস্পিনারের সোজা আসা বলটা কি ভেবে যেন ছেড়ে দিল।
সঙ্গে সঙ্গে সাজিদের নিশ্চিত অভিষেকটায় একটা প্রশ্নবোধক চিহ্ন বসিয়ে দিলেন, মাঠের পাশে বসে থাকা কোচ। ইংরেজীতে প্রধান নির্বাচককে যা বললেন, তার অর্থ এরকম, ‘এই তোমাদের দারুণ পারফরমার! এর চেয়ে তো দলে যারা আছে, ওরা ভালো...’
প্রধান নির্বাচক আমতা আমতা করে বললেন, ‘কিছু একটা সমস্যা হচ্ছে ওর। নইলে এই বলে তো ওর ভুল করার কথা না।’
কোচ-নির্বাচকের এই আলোচনাটা সাজিদ মোটেও শুনতে পায়নি। কিন্তু বেশ বুঝতে পারছে, ঝামেলা হয়ে যাবে। ঝামেলা থেকে বাচতেই দলের সঙ্গে শৌখিনভাবে ঘুড়ে বেড়ানো মনস্তত্ত্ববিদ শুভঙ্কর রায়ের সঙ্গে কথা বলতে গিয়েছিল সাজিদ।
সিলেটের ছেলে সাজিদ, এসব মনস্তত্ত্ববিদ-টিদকে কোনোদিন পাত্তা দেয়নি। তারপরও রুমমেট রাজ্জাক ভাইয়ের কথায় শুভঙ্করদার কাছে গেল। সব শুনে টুনে থিওরি অব রিলেটিভিটিআবার আবিস্কারের মতো মুখ করে ফেললেন শুভঙ্কর রায়,
‘আরে সাজিদ! এটা কোনো ব্যাপার হল? তুমি পড়াশোনা করা ছেলে, এমন স্বপ্নের কারণ তো নিজে ভেবেই বের করতে পারো।’
সাজিদ পড়াশোনা জানা ছেলেÑএটা কিন্তু সত্যি কথা। ক্রিকেটের ফাকেই কিভাবে কি করে যেন সে বেশ ভালো ছাত্র হিসেবে নিজেকে ধরে রেখেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফলিত পদার্থবিজ্ঞানের মতো ভয়ঙ্কর একটা বিষয়ে পড়াশোনাও চালিয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু এই পড়াশোনা দিয়ে স্বপ্নের ব্যাখ্যা কিভাবে খুজে পাওয়া যাবে, সেটা সাজিদ ঠিক বুঝওতে পারল না। নাকি শুভঙ্করদা পড়াশোনা বলতে ‘খোয়াবনামা’ পড়া বোঝাতে চেয়েছেন। কিছুই বুঝতে না পেরে সাজিদ বললো,
‘কিন্তু দাদা, আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।’
শুভঙ্কর বাবু খুব মজা পেলেন, ‘আরে দূর! এটা কোনো ব্যাপারই না। তুমি জাতীয় দলে প্রথম খেলতে যাচ্ছো, তাই এখন নিজের খেলা নিয়ে অবচেতন মনে নানারকম শঙ্কা তৈরি হচ্ছে। জাতীয় দলে খেলাটা তো তোমার কাছে স্বপ্নের মতো। তুমি ভেতরে ভেতরে ভয় পাচ্ছো, স্বপ্নটা না ভেঙে যায়।’
‘না তো! এরকম ভয় তো পাচ্ছি না।’
‘পাচ্ছো। তুমি যে এই ভয় পাচ্ছো, তা তোমার সচেতন মন জানে না।’
‘তাই নাকি!’
‘ফলে যেটা হচ্ছে... তোমার অবচেতন মনের এই ভয়ের ফলে তুমি অভিষেকের স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছ।’
সাজিদ সামান্য হলেও যুক্তি খুজে পেল শুভঙ্করদার কথায়। মনে হল, এটা হলেও হতে পারে। খানিক্ষন মাথা-টাথা চুলকে বললো,
‘তাহলে এখন আমি কি করবো?’
‘কিচ্ছু না। ব্যাপারটা বুঝেছ। আর এটাকে পাত্তা দিও না। তাহলেই স্বপ্নটা আর দেখবে না।’
কাশ সিক্স থেকে এ পর্যন্ত যে পরিমানে সেবা প্রকাশনীর বই সাজিদ পড়েছে, তাতে শুভঙ্করদার ব্যাখ্যা মেনে নিতে খুব কষ্ট হল না। নিজেকে বরং উপন্যাসের কোনো চরিত্র মনে করে নিয়েই শুভঙ্করদার রুম থেকে বেরিয়ে এলো।
ড্রেসিংরুম হয়ে যখন মাঠে পা রাখল, ততক্ষনে সাজিদের মন ভালো হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে, এখন চাইলেই সেন্টার উইকেটে গিয়ে একটা সেঞ্চুরি মেরে আসতে পারবে সে।
তিন-চার দিন পর এমন উজ্জ্বল চেহারার সাজিদকে দেখে এগিয়ে এলো ওদের ক্যাপ্টেন। আজ প্র্যাকটিস নেই। তারপরও কেউ ফিজিওর সঙ্গে কাজ করতে, কেউ নেটে নক করতে; অনেকেই মাঠে চলে এসেছে। ক্যাপ্টেন কাছে এসে বললো, ‘কি মিয়া, তুমি নাকি কি সব স্বপ্ন দেখছ আজকাল?’
সাজিদ মুদু হাসল। ওদের ক্যাপ্টেন বেশ রসিক মানুষ। সাজিদের বেশ পছন্দ হয়েছে। সাজিদ কিছু বলছে না দেখে আবার সেই বললো, ‘যাই স্বপ্ন দ্যাখো ক্ষতি নেই। তবে আসল স্বপ্নের কথা মাথায় রেখো...’
সাজিদও কিছু একটা বলতে গিয়েছিল। তার আগেই রিং রিং করে উঠল ওর মোবাইল। ইচ্ছে করে এরকম আদ্দিকালের ফোনের রিং টোন লাগিয়ে রেখেছে ও। ক্যাপ্টেনের সামনে ফোন ধরতে চাচ্ছিল না। কিন্তু ক্যাপ্টেনই হেসে বললো, ‘ক্যারি অন। ফোন ধরো। দ্যাখো কোনো ভক্ত-টক্ত নাকি...’
হেসে ফোনটা কানে ছোয়ালো সাজিদ। ওপাশ থেকে খুব চেনা একটা কণ্ঠ শোনা গেল,
‘হ্যালো। সাজিদ বলছেন?’
কণ্ঠটা চেনার চেষ্টা করছে সাজিদ, ‘হ্যা। আপনি কে?’
‘আমি আপনার খুব কাছে মানুষ।’
সাজিদ ভাবছে আর কথা বলছে, ‘কে? কি বলতে চান?’
‘স্বপ্নটা এখনো দেখছ সাজিদ?’
সাজিদ প্রথমটা উত্তর খুজে পেল না, ‘কি স্বপ্ন? কে বলছিলেন?’
‘ওই যে তোমার বদলে আরেক জন খেলছে, সেই স্বপ্নটা...’
‘কে আপনি? এই স্বপ্নের কথা কিভাবে জানলেন? কে বললো আপনাকে?’Ñস্বপ্নটার বিস্তারিত তো শুভঙ্করদা ছাড়া কেউ জানে না! তাহলে কি শুভঙ্করদাই বলেছে?
‘আমাকে কেউ বলেনি সাজিদ। আমি তোমার সব স্বপ্নের কথা জানি।’
‘কিভাবে!’Ñচিৎকার করে উঠল সাজিদ। ওর ক্যাপ্টেন অবাক হয়ে চেয়ে রইল।
‘খুব সোজা। কারণ, তোমাকে স্বপ্নটা আমি দেখাচ্ছি।’
সাজিদ আর কোনো কথা খুজে পেল না। ওপাশের কণ্ঠটা একটু বিরতি দিয়ে আবার বললো, ‘সাজিদ, তোমার অভিষেক হবে না। আরেক জন খেলবে তোমার বদলে।’
কোনোক্রমে ধরা গলায় সাজিদ জিজ্ঞেস করলো, ‘আপনি কি চান?’
‘আমি চাই আমার স্বপ্নপূরন করতে।’
সাজিদ কথা বলতে পারছিল না। তারপরও নিজেকে যেন পাতাল থেকে টেনে তুলে বললো, ‘কে আপনি?’
‘আমিও সাজিদ।’
সাজিদ এবার কণ্ঠটা চিনতে পেরেছে।
****
সাজিদের ব্যাপারটা সিনেমার কাহিনী বলে উড়িয়ে দেওয়া যেত। অন্তত শুরুতে রাজ্জাক ভাই আর শুভঙ্করদা তাই চাচ্ছিল। শুভঙ্করদা জোর দিয়ে বলছিল, এমন কোনো ফোন আসেনি। কিন্তু ক্যাপ্টেন সামান্য সাজিদের পক্ষ নিল।
ক্যাপ্টেনের মোহাম্মদপুরের বাসায় বসে আলোচনা হচ্ছিল। এখনও ব্যাপারটা এই চার জনের বাইরে কাউকে জানানো হয়নি। জানালে হাসা-হাসি করার লোকসংখ্যা বাড়া ছাড়া আর কিছু হতো না। সঙ্গে সাজিদের অভিষেকটা আরও ঝুকির মধ্যে পড়ে যেত।
আপাতত অবশ্য ক্যাপ্টেন ওকে ভরসাই দিয়ে যাচ্ছেন, ‘দ্যাখো, সাজিদ, আমি বিশ্বাস-অবিশ্বাস কিছুই করছি না। কিন্তু এটুকু জানি যে, এই ঝামেলাটাকে তোমার এড়াতে হবে। এই ঝামেলা মাথায় নিয়ে তুমি ইন্টারন্যাশনাল ম্যাচ খেলতে পারবে না। আমি জানি, তুমি ঝামেলাটা এড়াতে পারবে।’
রাজ্জাক ভাই চায়ের কাপে আরেকটা চুমুক দিয়ে বললো, ‘না পারার তো কোনো কারণই দেখছি না। আমার তো মনে হয়, সাজিদ পুরো ব্যাপারটা কল্পনা করছে...’।
রাজ্জাক ভাইয়ের কথা মাটিতে তো দূরে থাক, টেবিলেও পড়তে দিলেন না শুভঙ্করদা, ‘অবশ্যই কল্পনা করেছে। স্বপ্নটা দেখতেই পারে। কিন্তু ফোনটা ওর কল্পনা...’।
সাজিদকে কিছু বলতে হল না। ক্যাপ্টেনই জবাব দিল, ‘তা হয় কি করে! ফোন যে এলো, সেটা তো আমারই সামনে।’
শুভঙ্কর রায় এবার চোখমুখ শক্ত করে বললেন, ‘সাজিদ মন খারাপ করো না। আমি একটু আমার মতো করে ব্যাখ্যা দেই?’
সাজিদ ঘাড় নাড়ল, শুভঙ্করদা বললেন, ‘আসলে সাজিদকে এখন তার অবচেতন মনই নিয়ন্ত্রন করছে বলে আমার ধারণা। অন্য কোনো ফোন এসেছিল। ও সেটা কেটে দিয়ে ফোনে কাল্পনিক একটা চরিত্রের সঙ্গে কথা বলেছে। আসলে সে সময় ওই প্রান্তে কেউ ছিল না বলেই আমার ধারণা।’
ক্যাপ্টেনও একটু প্রভাবিত হল শুভঙ্করদার কথায়? হতে পারে। আলোচনা যতো আগেড় বাড়তে লাগল, ততোই সাজিদের মনে হল, এরা তিনজনই এখন ওকে মানসিক রোগী ভাবতে শুরু করেছে। এরা আর সাজিদের কোনো সাহায্য করতে পারবে না। সাজিদকে এখন যা করার নিজেকেই করতে হবে।
এখন সাজিদকে অপেক্ষা করতে হবে আবার ফোনের জন্য।
রাত তিনটের দিকে ফোন এলো। ফোন যে আসবে, সাজিদ জানতো। জানতো বলেই আজ ঘুমায়নি। ফোনটা সাইলেন্ট করে ভাইব্রেশন দিয়ে রেখেছে; যাতে রাজ্জাক ভাই কিছু টের না পায়। ভাইব্রেশন অবশ্য দেওয়ার দরকার ছিল না। ফোন থেকে এক মুহুর্তের জন্যও মনে হয় চোখ সরায়নি সাজিদ।
অবশেষে ঠিক তিনটে চৌদ্দ মিনিটে ফোনের আলোটা জ্বলে উঠলÑলেখা উঠল পধষষরহম ঁহশহড়হি হঁসনবৎ। ফোনটা নিয়ে বারান্দায় চলে এলো সাজিদ। দুই রুমের বাসা। এক রুমে সাজিদ আর রাজ্জাক ভাই থাকে। আরেক রুমে সোহেল নামে রাজ্জাক ভাইয়ের এক বন্ধু থাকে। বরান্দায় চলে এলে আর কোনো সমস্যা নেই।
এবার আর ফোনটা ধরতে ভয় পেল না সাজিদ। নার্ভাসনেসটা কেটে গেছে। ও বুঝেছে জাতীয় দলের হয়ে খেলতে গেলে, এই খেলাটায় অংশ নিতে হবে ওর। নার্ভাস খেলোয়াড় কখনো জিততে পারে না।
ফোটা ধরেই সাবলীল গলায় সাজিদ বললো, ‘হ্যালো। কে বলছেন?’
ওপাশ থেকে পরিচিত কণ্ঠ শোনা গেল, ‘আমিও সাজিদ।’
‘বলুন।’
‘কি হল? ক্যাপ্টেনের পরামর্শ নিয়ে কি লাভ হল?’
‘সবই তো জানেন। ওটা আর জিজ্ঞেস করে লাভ কি? এখন বলুন কি চান।’
‘চাই তো, একটাই জিনিস। তোমার অ্যাক্রিডেশন কার্ডটা।’
এবার সাজিদ না চমকে উঠে পারল না, ‘মানে?’
‘সাজিদ হিসেবে তোমার যা যা আছে, আমারও আছে। আমারও চেহারা তোমার মতো, আমারও ব্যাটিং তোমার মতো, আমার সবই কিছুই তোমার মতো; কারণ আমিও সাজিদ। আমার কাছে নেই শুধু ড্রেসিং রুমে ঢোকার অনুমতি। সেই অ্যাক্রিডেশন কার্ডটা দিতে হবে তোমার।’
‘এতো কিছু আপনি নিজে করতে পারলেন, এটা ম্যানেজ করুন না। আর আপনি চাইলেই আমি দেবো কেনো?’
‘দেবে সাজিদ, দেবে। তুমি এখনও বুঝতে পারোনি, আমি কি জিনিস। বুঝতে পারলেই দেবে।’
সাজিদ এবার খেলাটায় একটু মজা পাচ্ছে, ‘আপনিও বুঝতে পারেননি আমি কি জিনিস। আমি অ্যাক্রিডেশন কার্ড দেবো না।’
ওপাশ থেকে মৃদু একটা হাসির শব্দ শোনা গেল। লোকেদের ছেলেমানুষী দেখলে সাজিদ যেভাবে হাসে, তেমনই হাসি, ‘কাল ঠিক চারটের সময় তুমি কার্ডটা দিতে রাজী হয়ে যাবে। কারণ, তার ঠিক দশ মিনিট আগে তোমাদের বাসার সামনের চায়ের দোকানকার অ্যাক্সিডেন্ট করে মারা যাবে।’
‘কি বলছেন এসব!’Ñনিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না সাজিদ।
‘হ্যা। ওটা হবে বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপন দেখে যদি তুমি অ্যাক্রিডেশন কার্ড দিতে রাজী না হও, তাহলে দেখবে পুরো সিনেমা। সেই সিনেমার প্রথম দৃশ্যেই রাত বারোটায় সিলেটে তোমার বাবা মারা যাবেন ছাদ থেকে পড়ে গিয়ে।’
‘ওই মিয়া! কি বলেন এগুলো!’Ñচিৎকার করে উঠল সাজিদ। কিন্তু সাজিদের সে চিৎকার শোনার জন্য ফোনের ওপাশে আরেক সাজিদ তখন আর নেই। লাইন কেটে দিয়েছে।
সাজিদের চিৎকার শুনে রাজ্জাক ভাই উঠে এসেছে, ‘কি হয়েছে?’
‘কিচ্ছু না।’Ñমুখ শক্ত করে দাড়িয়ে রইল সাজিদ। বেশিক্ষন দাড়িয়ে রইল না। আস্তে আস্তে ভেতরে হেটে গেল। ও খুব ভালো করে জানে, ওকে এখন রাজী হতেই হবে। কাল বিকেল ঠিক চারটেই ওকে রাজী হতে হবে। তারপরই জমবে খেলা।
কিন্তু খেলা জমার আগেই একটা লোককে মারা যেতে হবে। এই মৃত্যুটা সাজিদ চাইলেও ঠেকাতে পারে না, ঠেকাবে না। খেলা জমে ওঠার জন্যই মৃত্যুটা দরকার।
****
‘ক্যাপ্টেন, আমাকে নিয়ে আর দুশ্চিন্তা করার দরকার নেই।’
সাজিদ কথাটা না বললেও চলতো। দু দিন ধরেই ক্যাপ্টেনের মনে হচ্ছে, সাজিদকে নিয়ে আর দুশ্চিন্তা করার দরকার নেই।
সেই আগের মতো হাশি-খুশি, মনোযোগী সাজিদ ফিরে এসেছে। নেটে প্রত্যেকটা বল দেখেশুনে খেলছে। এমনকি আজ নিজেদের মধ্যে যে প্র্যাকটিস ম্যাচ ছিল, সেখানেও দুর্দান্ত করেছে। ৭২ বলে ৮৬ রানের অপরাজিত একটা ইনিংস খেলেছে।
ফলে, শুধু ক্যাপ্টেন না, সবাই বুঝতে পারছে, ওকে নিয়ে আর ভাবনার দরকার নেই। কোচ নিজে এসে সাজিদকে বলে গেছেন, ‘বি রেডি। আগামীকাল খেলছ তুমি।’
তারপরও ক্যাপ্টেন হেসে বললো, ‘সব সমস্যা মিটেছে?’
‘হ্যা। আসলেই আমার কল্পনা ছিল সবকিছু। এখন সব ঠিক হয়ে গেছে।’
ঠিক না হয়ে উপায় নেই। সাজিদ কথা দিয়ে দিয়েছে। পরশু ঠিক বিকেল তিনটে পঞ্চাশ মিনিটে রাস্তা পার হয়ে পানি আনতে গিয়ে ট্রাক চাপা পড়ে মারা গেছে ওদের বাসার সামনের চায়ের দোকানদার। কথা না দিয়ে আর উপায় ছিল না।
ঠিক চারটের সময় ফোন এসেছে। সাজিদ ফোনের জন্য অপেক্ষা করছিল। ফোন না ধরে তো উপায় নেই। খেলা জমে গেছে। ও শুধু জানতে চেয়েছিল, খেলাটা কোথায় হবে, ‘কোথায় আসতে হবে অ্যাক্রিডেশন কার্ড নিয়ে?’
‘রমনা পার্কে।’
‘কখন?’
‘দেরী আছে। খেলার ঠিক আগের রাতে। আটটার সময় হোটেল থেকে বেরোবে। পার্কে আমার সঙ্গে দেখা হবে আটটা বিশ মিনিটে।’
‘পার্কে কোথায় থাকবেন আপনি?’
‘তা তোমাকে জানতে হবে না। তুমি বটমূলের কাছে দাড়িয়ে থাকবে।’
‘আচ্ছা। আমার কিছু কথা জানার ছিল।’
‘বলো।’
‘আপনি আসলে কে?’
‘সেটা তো বলা যাবে না। তবে এটুকু বলি যে, আমি আসলেই দেখতে তোমার মতো। অবশ্য আমি মোটেও ভালো ব্যাটিং করি না। আসলে আমি কখনোই ক্রিকেট খেলি না। আমি তোমাকে গত তিন বছর ধরে ফলো করছি। আমার জীবনের স্বপ্ন একটাইÑঅনেক টাকার মালিক হওয়া। তোমার বদলে আমি যদি জাতীয় দলে খেলি, তাহলে অনেক টাকার মালিক হতে পারবো।’
‘আজব কথা! আপনি ক্রিকেট খেলতে পারেন না, তাহলে ক্রিকেট খেলে অনেক টাকার মালিক হবেন কি করে?’
‘সেটা আমার ওপর ছেড়ে দাও। যে লোক তোমাকে পর পর তিন রাত একই স্বপ্ন দেখাতে পারে, দেশের যে কোনো জায়গায় মানুষ মেরে ফেলতে পারে; সে রানও করতে পারবে। আমার দরকার শুধু একবার জাতীয় দলের জার্সি গায়ে তোলা।’
‘ঠিক আছে। সে সুযোগ পাবেন আপনি।’
‘আরেকটু কথা আছে। তুমি ন্যাশনাল টিমের পোশাক পরবে না। কালো জিন্স পরবে আর এক্কেবারে সাদা একটা শার্ট।’
‘ঠিক আছে।’
সব কথায় রাজী হয়ে গেছে সাজিদ। রাজী না হয়ে উপায় নেই। খেলায় আম্পায়ার, ম্যাচ রেফারি, বোলার; সব ওই সাজিদ। তাকে শুধু ব্যাট করতে হবে; স্লগ ওভারের ব্যাটিং। সেটা করতেই আজ রাতে বের হবে।
রাতে বেরোতে তেমন ঝক্কি পোহাতে হলো না। বললো, এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা করবে শাহবাগে। ক্যাপ্টেন শুধু বললো, ‘রাত করো না। এমনিতে ম্যাচের আগের রাতে এরকম বেরোনো ঠিক না। শুধু তুমি বলে...’
‘টেনশন কইরেন না, ক্যাপ্টেন। আমার কিছু হবে না।’
সাজিদ একটু আগে বেরিয়ে পড়েছে। আসলেই শাহবাগে ওর এক বন্ধু অপেক্ষা করছিল। ইউনিভার্সিটির বন্ধু, রাজনীতি করে। আজিজ সুপার মার্কেটের কোনায় দাড়িয়ে ছিল।
সাজিদকে দেখেই এগিয়ে এলো, ‘কি রে, তোর এইসব মালের দরকার হলো কেনো?’
‘দরকার আছে। তোর বোঝার দরকার নেই। আর প্লিজ দোস, আমি যে এই জিনিসটা নিয়েছি, সেটা স্রেফ ভুলে যা।’
বন্ধুটা হতাশ একটা ভঙ্গি করে বললো, ‘ঠিক আছে।’
এবার কাধে ঝোলানো ব্যাগ থেকে ছোট্ট একটা বোতল বের করে দিল সাজিদের হাতে। মুখে বললো, ‘সাবধানে হ্যান্ডেল করিস।’
সাজিদ ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। শুধু ‘থ্যাংকস’ বলেই হাটা দিল।
অবশ্য সাজিদের এমন কিছু দেরী হয়নি। বটমূলে পৌছে দেখে আটটা বাজতে তখনও তিন মিনিট বাকী। দীর্ঘদিন সিগারেট খায় না সাজিদ। আজ শখ করে একটা সিগারেট নিয়ে এসেছে। সিগারেটটা মুখে ঝুলিয়ে দাড়িয়ে রইল। কি যে ভাবছে।
‘কি ভাবছ? সিগারেট ধরিয়ে ফেল’Ñধবধবে সাদা শাট, কালো জিন্স পরে সাজিদের ঠিক পিঠের কাছে দাড়িয়ে আছে সাজিদ।
প্রথমটা চমকে গেলেও এক পলকে স্বাভাবিক হয়ে গেল সাজিদ, ‘ও হ্যা।’
গ্যাস লাইট বের করার জন্য পকেটে হাত ঢুকিয়ে বের করে আনল বোতলটা। বোতলটা দেখেই হিংস্র একটা শব্দ বেরিয়ে এলো আরে জনের মুখ থেকে, ‘অ্যাসিড!’
সাজিদ লাফ দিয়ে পড়ল সাজিদের গায়ের ওপর। জাপটাজাপটিতে মিলেমিশে গেল দুই সাজিদ। কে কোন জন? শুধু একসময় শোনা গেল প্রবল একটা চিৎকারÑযন্ত্রনার চিৎকার, হাহাকারের চিৎকার।
*****
টসে জিতে ব্যাটিং করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ক্যাপ্টেন। মিরপুর স্টেডিয়ামে যেন লোক ধরছে না। মহাউত্তেজিত কণ্ঠে বাংলাদেশ-পাকিস্তান ম্যাচ শুরুর বর্ননা দিয়ে চলেছেন ধারভাষ্যকাররা।
বাংলাদেশী দুই ওপেনার বেরিয়ে এসেছেন ড্রেসিং রুম থেকে। ক্যামেরার দিকে চেয়ে হেলমেটের ফাক থেকে মৃদু মৃদু হাসছে সাজিদ।
হাসিটা দেখে একটু যেন গা গুলিয়ে উঠল ক্যাপ্টেনের। এ কোন সাজিদ?

ইত্তেফাক সাহিত্য সাময়িকীতে প্রকাশিত

শুক্রবার, ২৪ জুন, ২০১১

অমর মানুষ

বিস্তর টাকার দরকার সাদেক আলমের। ‘বিস্তর’ বলে অবশ্য টাকার পরিমানটা ঠিক বোঝানো যাচ্ছে না। গুনে গুনে এক কোটি টাকা দরকার তার।
সমস্যাটা হল, এক কোটি টাকা কারো পকেটে তো দুরে থাক, মানি ব্যাগে কিংবা ড্রয়ারেও থাকে না। কে জানে, অতি বড়লোকদের ড্রয়ারে হয়ত থাকে। কিন্তু সাদেক আলম অতি বড়লোক না। সাদেক আলম আসলে মেজলোক, সেজলোকও না। সে নিতান্তই ছোটলোক।
ছোটলোক বলেই এক কোটি টাকার প্রয়োজন সাদেক আলমকে বিরাট একটা সমস্যায় ফেলে দিয়েছে। তাদের ব্যাংকে এই পরিমান টাকা কোনোদিন ক্যাশ আসে না। ফলে ব্যাংক ডাকাতি-ফাকাতি করে লাভ নেই।
একটা উপায় ছিল। সাদেক আলমের বড় সাহেব কাসেম সাহেবের কিছু টাকা-পয়সা মেরে দিতে পারলে সে অনায়াসে এক কোটি টাকার মালিক হয়ে যেতে পারত। কাসেম সাহেব কয়েক শ কোটি টাকার মালিক বলে সে গল্প শুনেছে। কিন্তু কাসেম সাহেব যে এই কোটি কোটি টাকা কই রাখেন, সেটা সাদেক এখনও আবিস্কার করে উঠতে পারেনি। তাই কাসেম সাহেবের টাকাটা আপাতত লোপাট করা হচ্ছে না।
হচ্ছে না, বললে তো আর টাকার সমস্যা সমাধান হয় না। বরং প্রতিদিন সকালে উঠেই সাদেকের মনে হচ্ছে, আজ অবশ্যই ওই এক কোটি টাকা জোগাড় করা দরকার। পরিমানটা নিশ্চিত হওয়ার জন্য আজ সকালে সাদেক আবার ফোন করেছিল কিনিকটায়,
‘ভাই, এক কোটি টাকার কমে কি কোনোভাবেই কাজটা হয় না?’
‘কে? কে বলছিলেন!’Ñওপাশ থেকে এক মহিলা কর্কশ কণ্ঠে প্রায় চিৎকার করে উঠেছে। খুন করার অভ্যেস করে ফেলতে পারলে, সাদেক নিশ্চিত এই মহিলাকে খুন করে ফেলত।
তারপরও মেজাজটা ঠাণ্ডা করে জবাব দিয়েছে, ‘আমি। আমি সাদেক আলম। ওই যে আপনাদের বিজ্ঞাপনটার ব্যাপারে...’
‘ওহ। সেই বিজ্ঞাপন? সেটা তো আমরা বিজ্ঞাপনেই পরিস্কার করে বলে দিয়েছি। এক কোটি টাকার নিচে কিছুই হবে না। ভাই শোনেন, এসব খয়রাতী লোকের কাজ না।’
‘ও আচ্ছা!’Ñবলে হতাশ হয়ে লাইনটা কেটে দিল সাদেক।
আর কোনো উপায় সে দেখতে পাচ্ছে না। শেষ পর্যন্ত আর সবার মত মরেই যেতে হবে সাদেক আলমকেও! বড় আশা করেছিল এক কোটি টাকা জোগাড় করে অমর হবে সে। আহা রে!

দৈনিক ভূমিকম্প টাইপের একটা পত্রিকায় ছাপা হওয়া একটা বিজ্ঞাপনই আসলে সাদেক আলমকে স্বপ্নটা দেখিয়েছিল। শুধু স্বপ্ন দেখিয়েছিল বলাটা ভুল হবে। সাদেক আলমকে ওই বিজ্ঞাপনটাই আজ এরকম লোভী করে তুলেছে।
এমনিতে সাদেক আলম ছা-পোষা মানুষ। মানে, ছা-পোষা মানুষের যেমন বর্ননা গল্পে থাকে, সাদেক আলম ঠিক সেরকম মানুষ। সকাল আটটায় বেরিয়ে সাড়ে দশটায় অফিসে পৌছায়, প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে বড় সাহেবের গালি খায়, বিকেল বেলা আবারও বাসে লোকেদের ধাক্কা খায় আর রাতে বাসায় ফিরে বড় আপার ধ্যাতানি খায়।
এই জীবন নিয়ে সাদেকের কোনো আফসোস ছিল না। বরং এই জীবনটাই টেনে আরেকটু লম্বা করতে পারলে খুশি হত সে। সেই সুযোগটাই পেয়ে গেল বিজ্ঞাপনটায়!
এত্তা বড় বড় ল্যাপটানো অরে লেখাÑঅমর হউন! তারপর অনেক ইদং করে বর্ননা করে হয়েছে, অমর হওয়ার ঔষধ বাংলাদেশে আমদানী করা একমাত্র সংস্থার বিজ্ঞাপনটা। এর আগে কোন দেশের কোন বড় লোক, শিল্পপতি, চিত্রতারকা এই ওষুধ ব্যবহার করেছেন, সে বর্ননা দেওয়া আছে। আর এক্কেবারে শেষ বেলায় যেয়ে বলা হয়েছে আসল কথাটাÑ
তিন দফায় এই ওষুধ ব্যবহার করিতে বাংলাদেশী মুদ্রায় ৯৬ ল ৮৪ হাজার টাকা খরচ হইবে। হাসপাতালে থাকাসহ অন্যান্য খাতে আরও প্রায় চার ল টাকা খরচ হইবে।
হেহ! এতো কথার এক কথা, অমর হতে সাদেক আলমের এখন এক কোটি টাকা লাগবে। দু চার হাজার বেশি লাগলে সমস্যা নেই। সাদেক আলমের অ্যাকাউন্টে সাত হাজার কত টাকা জানি আছে। কিন্তু আসলটাই তো হল না। সেই এক কোটি টাকা!
আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিল সাদেক। ঠিক এই সময় হঠাৎ মনে পড়ে গেল মোতালিব মামার কথা। মনে পড়তেই রাগে নিজের মাথার চুল ছিড়তে ইচ্ছে করল। অ্যাতো দিন ধরে কেন কথাটা মনে পড়েনি!
মোতালিব মামা মোটেও সাদেকের আপন মামা না। এমনকি চাচাতো, মামাতো বা খালাতো মামাও না। সাদেক আলমের মায়ের ফুফাতো ভাই এই মোতালিব মামা। কি করে যেন ফেপে ফুলে বিরাট বড়লোক হয়েছেন। এখন কী যেন বলে. ওই যে একটা মটর কোম্পানি না কিসের যেন মালিক হয়ে গেছেন। মোতালিব মামার তিন কুলে কেউ নেই, সাদেক আর তার আপা ছাড়া।

মোতালিব মামার বাসায় গেলেই তিনি প্যাকেটে এক কোটি টাকা ভরে সাদেকের হাতে তুলে দেবেন. এমন ভাবার কোনো কারণ নেই। হাড় কিপ্পিন মোতালিব মামার হাত থেকে একটা টাকা বের করা মুশকিল।
থাকেন একটা ভাড়া বাড়িতেÑদুই তলায় দুই রুমের বাসা। বেশি খরচ হবে বলে স্থায়ী কাজের লোক পর্যন্ত রাখেন না। কাজের লোক বলতে একটা বুয়া। দুপুরে এসে দুই বেলার মত রান্না করে দিয়ে যায়। সকালে পাউরুটি আর কলা দিয়ে কাজ সারেন তিনি।
সবসময় যেমন হয়, এবারও সাদেক আলমকে দেখে মহাবিরক্ত হলেন মোতালিব মামা, ‘কী, মরছি নাকি সেই খোজ নিতি আইছো? এহোনো মরিনাই। আর মরলিও তুমি কিছু পাবা না। সব দিয়ে যাবো তোমার আপারে। তোমার মত অপগণ্ডরে কিছু দিয়ে লাভ নেই।’
সাদেক মহাবিনয়ী, ‘আপনার টাকার জন্য আসিনাই মামা। আপার বাসায় থাকার একটু সমস্যা হচ্ছে। কয়দিন পরই চলে যাবো।’
‘থাকো। কিন্তু খাওয়ার খরচ দিতি পারব না। বাজার-টাজার করতে হবে।’
সাদেক সবকিছুতেই রাজী। তার মাথায় দারুণ একটা প্লান আছে। প্লানটা কঠিন কিছু না। মোতালিব মামার একটা চেক জাল করে ফেলা। সহজে ধরা খাওয়ার চান্স নাই। কারণ, মামা ব্যাংকে খুব একটা যোগাযোগ রাখেন না। মাঝে মাঝে শুধু টাকা জমা দেন। সমস্যা একটাই, একবারে কোনো ব্যাংক থেকে এতো টাকা ঝামেলা ছাড়া তোলা যাবে কিনা।
অবশ্য কোনো ঝামেলাই করতে হল না সাদেককে। তার আগেই ভাগ্য বদলে দেওয়া একটা কাহজ হাতে পেয়ে গেল সে। এমন কিছু না, একটা জীবন বীমার কাগজ। মামার বিছানার তলায় হাতাতে গিয়ে পেয়ে গেল সাদেক।
আর কাগজটাই চোখ খুলে দিল তার। দেড় কোটি টাকার একটা জীবন বীমা আছে মোতালিব মামার। মামা মারা গেলে টাকাটা পাবে তার নমিনি। আর নমিনিটা কে? খোদ সাদেক আলম!
এবার সাদেক বুঝল, মামা কেন বছর দুয়েক আড়ে তার পাসপোর্ট সাইজের ছবি চেয়েছিল। সঙ্গে সঙ্গে ‘কি করতে হবে’ বুঝে ফেললো সেÑমামাকে সরিওেয় দিতে হবে।
কিন্তু ‘সরিয়ে দিতে হবে’ বললেই তো আর হল না। পুলিশ আর ইন্সুউরেন্স কোম্পানির লোকজনের মনে সন্দেহ না তৈরি করে সরাতে হবে। কাজটা সোজা না। গত এক সপ্তাহ ধরে কাজটা করার উপায় ভাবছে সাদেক। উপায় বের করার জন্য সে একটা পর একটা ইংরেজী সিনেমাও দেখা শুরু করল। ইংরেজী সিনেমাগুলোয় খুন করার দারুণ সব উপায় দেখানো হয়।
বললে বিশ্বাস করবেন না, ওই একটা সিনেমা থেকেই আইডিয়াটা পেয়ে গেল সাদেক। খুবই সোজা আইডিয়া। কোনো ভারী অস্ত্রপাতি লাগবে না, বিষ লাগবে না। লাগবে স্রেফ একটা হাইপোডার্মিক সিরিঞ্জ। শুনতে যতই খটমটে নাম হোক, আসলে ওই যে স্রেফ ইনজেকশন করার সিরিঞ্জ।
অবশেষে দিনটা পেয়ে গেল সাদেক।
‘শরীর কেমন খারাপ লাগতিছে’ বলে সকাল সকাল শুয়ে পড়েছিলেন মোতালিব সাহেব। সাদেকও ‘ডাক্তার ডাইকে আনি’ বলে বেরিয়ে গেল। যাওয়ার সময় পাশের ফাটের মতিন সাহেবকে বলে গেল, ‘মামার শরীর খারাপ; একটু খেয়াল রাখবেন।’ ফিরে এল পাঁচ টাকা দামের একটা সিরিঞ্জ কিনে নিয়ে।
মামার রুমে ঢুকে ডাক দিল, ‘মামা। ও মামা!’
‘হু’
‘ডাক্তার কইুছে পরে আসবে। একটা ইনজেকশন করে দিতি কইলো।’
‘ইনজেকশন করবে কেডা?’
‘আমি পারি তো। প্যারামেডিকের টেনিং নেলাম না সেবার?’
মামা আর কথা বাড়ালেন না। হাত বাড়িয়ে দিয়ে চোখ বুজলেন। সিরিঞ্জটা বের করে স্রেফ পাঁচ সিসি বাতাস টেনে নিল সাদেক। আর কিচ্ছু লাগবে না। এবার মামার হাত ধরে শিরাটা খুজে বের করল। কাপা হাতে জোর করে শিরায় ঠেলে দিল বাতাস। এবার যা করার বাতাসই করবে।
তাই করল। পনেরো মিনিটের মধ্যে ‘বুকে ব্যাথা, বুকে ব্যাথা’ বলে চিৎকার শুরু করলেন মোতালিব মামা। সাদেকও ‘ডাক্তার, ডাক্তার! পানি’ বরে চিৎকার শুরু করল। প্রতিবেশীরা ছুটে এলো এবং ‘হƒদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে’ মারা গেলেন মোতালিব মামা।

সাদেক আলম এখন একজন অমর মানুষ। সে যেমন ভেবেছিল, তার চেয়েও অনেক নিরাপদে সব ঝামেলা চুকেছে। সময় মতই ইন্সুরেন্স কোম্পানি টাকা দিয়ে দিয়েছে। সাদেক তিন দফায় অমরত্বের ওষুধ নিয়েছে শরীরে। এখন আর স্বাভাবিক কোনো কারণে তার মৃত্যু নেই।
সবচেয়ে বড় কথা, মোতালিব মামা মরার পর সাদেক আবিস্কার করেছে, এখন সে রীতিমত বড়লোক মানুষ। মামা আপার আর তার জন্য সমান সম্পদই রেখে গেছেন। এখন সে ইচ্ছে করলে আরও দু এক জন মানুষকে অমর করতে পারে। সাদেকের আপাতত একজন মানুষকে অমর করার পরিকল্পনা আছেÑতার বৌ।
হ্যা, সাদেক বিয়েও করছে। আজই ঘটক আসার কথা। এই জন্য শুক্বুরবার বিকেলে কোথাও যায়নি সাদেক। ধবধবে সাদা একটা পাঞ্জাবী পরে বাসায় বসে আছে।
কলিংবেল বেজে উঠতেই বুঝল, ঘটক, মানে তার এক চাচার শালা এসে গেছেন। দরজা খুলে অবশ্য একটু অবাক হল সাদেক। ঘটকের তো পুলিশের পোশাক পরে আসার কথা না।
এই ভদ্রলোকের পরনে পুলিশের পোশাক। বুকে কি সব তারা-টারা লাগানো। পকেটের ওপর ব্যাচে লেখা, সাবেত আলী।
পুলিশ হলেও সাবেত আলী লোকটা খারাপ না। হতভম্ব সাদেককে পাশ কাটিয়ে ভেতরে ঢুকেই বললেন,
‘মামার টাকায় দিন তাহলে ভালোই কাটছে সাদেক সাহেব?’
‘হ্যা, মানে, তা তো বটে।’
‘কিন্তু খুনটা তো না করলেও পারতেন। ক দিন পর তো এমনিতেই টাকাটা পেতেন।’
‘খুন! হাঃ হাঃ! কি বলেন আপনি! মাথা ঠিক আছে?’
‘মাথায় কোনো সমস্যা না। বুদ্ধিটা ভালোই করেছিলেন। কিন্তু পোস্টমর্টেম রিপোর্টে ধরা পড়ে গেছেন।’
‘পোস্টমর্টেম রিপোর্ট! সে তো কবেই আসছে। তাতে তো ডাক্তাররা কিচ্ছু পায়নি। সেই রিপোর্ট দেখেই তো ইন্সুরেন্স কোম্পানি টাকা দিল।’
‘সব সত্যি। কিন্তু ওই কিছু না পাওয়াটাই তো সমস্যা। কিছু একটা যে পেতে হত সাদেক সাহেব।’
‘কি পেতে হত?’
‘আপনি যে ইনজেকশন করেছিলেন, সেটার নমুনা তো মোতালিব সাহেবের রক্তে থাকার কথা।’
‘ইনজেকশন!’
‘‘হ্যা। এখানেই ভুলটা করেছিলেন। মোতালিব সাহেবের প্রতিবেশি মতিন সাহেবকে আপনি বলেছিলেন, ‘ইনজেকশন দিয়ে দিয়েছি।’ আমরাও পরে সেই সিরিঞ্জটা খাটের নিচে পেয়েছি। স্রেফ বাতাস শিরায় পাঠিয়ে দিলে যে কি হয়, ডাক্তাররা তো তা জানে। ফলে, আপনি ধরা পড়ে গেলেন সাদেক সাহেব’’।

সরকার পরে উকিল সাদেক আলমের ফাঁসি চেয়েছিল। কিন্তু আদালত সে কথা রাখেননি। একটু মুচকি হেসে বিচারক তার রায় শুনিয়েছিলেনÑ
সকল স্বাী স্বা ও উপস্থিত প্রমানাদি বিচার করে এই আদালত সিদ্ধান্তে পৌছেছে যে, আসামী সাদেক আলম সত্যিকারের অপরাধী।... আদালত তাকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করছে। এর আগ পর্যন্ত প্রচলিত যাবজ্জীবন নয়। অমর সাদেক আলম যতদিন বেচে থাকবেন, ততদিনই তাকে কারদণ্ড ভোগ করতে হবে।

প্রথম আলো বন্ধুসভার সাহিত্য ম্যাগাজিনে প্রকাশিত

বৃহস্পতিবার, ২৩ জুন, ২০১১

উড়ালী মাওলা

হাফহাতা শার্ট আর হাফ প্যান্ট পরে ঘরের চালে বসে আছেন করিম মাওলা। খালি খালি বসে নেই, অপো করছেন। একটু বাতাসের জন্য অপো করছেন। বাতাস এলেই উড়াল দেবেন। বেশিন অপো করতে হবে না। বাতাসের মতিগতি করিম মাওলার এখন মুখস্থ হয়ে গেছে। মিনিট খানেকের মধ্যেই একবার না একবার হালকা একটু বাতাস আসবে। তাতেই বেশ উড়ে যেতে পারবেন।
বাতাস এসে গেছে। করিম মাওলা লাফ দেওয়ার প্রস্তুতি নিলেন। এর মধ্যেই উঠোন থেকে সালেহা বানুর গলা শোনা গেল, ‘এহন আবার কোহানে যাও?’
করিম মাওলার একত্রিশ বছর আগে বিয়ে করা বউ সালেহা বানু। একত্রিশ বছর ধরে এই ভদ্রমহিলার মুখে শুধু প্রশ্নই শুনে যাচ্ছেন তিনি। উত্তর খুব একটা দেন না। চুপচাপ থাকেন। এবার উত্তর না দিলে চলে না। তাই বললেন, ‘বাজারে।’
‘বাজারে যাবা সেডা এট্টু কইয়ে গেলি ভালো হইত না? যাইয়ে তো খালি চা-বিড়ির সব্বনাশ করবা। কিছু কেনা কাটা করা দরকার সেয়া খেয়াল আছে?’
‘কি?’Ñএই বাতাসটা গেল, করিম মাওলার ওড়া হল না।
‘আসার সময় দয়া হলি কয়ডা জিরে আর তরকারী-মরকারী নিয়ে আইসো।’
আবার বাতাস আসছে। আর উত্তর দেওয়ার জন্য দেরী করলেন না মাওলা সাহেব। দু হাত শূন্যে মেলে দিয়ে চাল থেকে ঝাপ দিলেন। একটুও নিচে নামলেন না। বাতাসে ভেসে রইলেন। সাতার কাটার মতো করে দু হাত সামনের দিকে চালাতেই শূন্যে চলা শুরু করলেন। উড়ছেন করিম মাওলা।
করিম মাওলা উড়তে পারেন। অনেক দিন ধরেই উড়তে পারেন। প্রাইমারী স্কুলের চাকরি থেকে যেবার রিটায়ার করলেন, তার পরের বছর শীতকাল থেকেই উড়তে পারেন মাওলা সাহেব। পাখির মতো উড়ে খুব বেশিদূর যেতে পারেন না। হাত-পা ব্যাথা হয়ে আসে। একবার উড়ে মাইল দশেক দূরের মল্লিকের ব্রিজে গিয়েছিলেন। ফেরার সময় খুব কষ্ট হয়েছিল।
মাওলা সাহেব যে উড়তে পারেন, এ নিয়ে শুরুতে গ্রামে বেশ হইচই হয়েছিল। ছোট চরের মধ্যে গ্রাম। হইচই তো হবেই। কিন্তু এখন আর হইচই হয় না। এখন দেখতে দেখতে সবার অভ্যেস হয়ে গেছে। গ্রামের সবাই মেনে নিয়েছে ব্যাপারটাÑকরিম মাওলা উড়তে পারে।
মানিক সাইকেল চালাতে পারে, কালাম খুব ভালো সাতরাতে পারে, করিম মাওলা উড়তে পারে। করিম মাওলা অবশ্য কোনো ট্রেনিং-ফেনিং নিয়ে উড়তে শেখেননি। হঠাৎ হয়ে গেছে।
একদিন নতুন বানানো প্রাইমারী স্কুলের ছাদে বসে ছিলেন। কেন যেন দু হাত ছড়িয়ে দিয়েই বসেছিলেন। হঠাৎ একটু দমকা বাতাস এসে উড়িয়ে নিয়ে গেল তাকে। সেই থেকে শুরু। প্রথম প্রথম কিছু সমস্যা হতো। যেমন, পাজামায় পা জড়িয়ে যাওয়াটা ছিল সবচেয়ে বড় সমস্যা।
স্কুল মাস্টারি শুরুর পর থেকে পাঞ্জাবী-পাজামা পরতেন করিম মাওলা। ওড়ার সময় মাঝে মাঝে পাজামায় পা জড়িয়ে গিয়ে কেলেঙ্কারি হতো। একদিন তো পড়েই গিয়েছিলেন। পড়তে পড়তে সাবুদের মেগনিশ গাছের মাথায় এসে আটকে গিয়েছিলেন। পরে হাচড়ে-পাচড়ে কোনোক্রমে নেমেছেন।
আরেকটা সমস্যা হতো নামার সময়। প্রথমদিকে বুঝতেন না বলে ওড়া শেষ করে নামার সময় পায়ে ব্যাথা পেতেন। পরে বুঝেছেন বিমানের মতো করতে হবে। একবারে ধপ করে না নেমে, একটু দৌড়ে থামতে হবে। নানা অভিজ্ঞতা দিয়ে করিম মাওলা এখন পাকা উড়ালী হয়ে গেছেন।
হ্যা, গ্রামের লোকজন মাওলা সাহেবকে এখন ‘উড়ালী মাওলা’ বলে ডাকে। তবু ভালো, কিছু একটা বলে ডাকে। আগে তো মাওলা সাহেবকে কেউ ডাকতোই না। উড়তে শেখার আগে মাওলা সাহেব এই চরে থেকেও যেন ছিলেন না।
স্কুলে মাস্টারি করতেন, ছাত্ররা তার কথা শুনত না। কথা শুনবে কি? কাশে ছাত্ররা থাকলে তো! মাওলা সাহেব একদিক দিয়ে কাশে ঢুকতেন, আরেক দিক থেকে হুড়মুড় করে কাশ থেকে বেরিয়ে যেত ছেলেপেলেরা। কোনোরকম লুকিয়ে-চুরিয়ে নয়, তার সামনে থেকেই বেরিয়ে যেতে। মাওলা সাহেবও কিছু বলতে পারতেন না।
হেডস্যারকে গিয়ে বললে তিনি উল্টো মাওলা সাহেবের উপর প্তি হয়ে বলতেন, ‘আপনিই তো একটা অপদার্থ। আর কারো কাশ থেকে ছাত্ররা এভাবে চলে যায়? আপনি হচ্ছে ম্যানতা মারা স্যার, আপনার সামনে দিয়ে পারে। এরকম ম্যানতা মারা মাস্টেরের চাকরিই তো থাকার কথা না।’
তা সরকারী চাকরি না হলে হয়তো রিটায়ার করার অনেক আগেই চাকরী চলে যেতো করিম মাওলার। চাকরি থেকেই বা লাভটা কি হয়েছে? শুধু তো হেডস্যার না। কারো কাছেই কোনো মানুষের মধ্যে পড়তেন না মাওলা সাহেব।
কমনরুমে গিয়ে বসলে তিনি যেন উপস্থিতই নেই, এমনভাবে আলোচনা হতো। অন্যান্য স্যাররা কতো গল্প করতেনÑকারো ছেলের অসুখ, কারো ছেলে ভালো রেজাল্ট করেছে, কারো বাতের ব্যাথা। একদিন মাওলা সাহেব বলেছিলেন, তার কোমরে ব্যাথা।
শুনে ঠ্যা ঠ্যা করে হেসে উঠেছিলেন হুজুর স্যার, ‘করিম মাওলার আবার কোমর, তাতে আবার ব্যাথা! ষাড়ের ইয়ে লাগাও মাওলা, ঠিক হয়ে যাবে।’
ষাড়ের ইয়ে খুজতে মাওলা সাহেব আর কোথায় যাবেন? নিজেকেই তো ষাড়ের ইয়ে মনে হতো তার। বাজারে গিয়ে তার বয়সীরা যেখানে আড্ডা দেয়, সেখানে বসলে কেউ কথা বলে না। ছোটরা যেখানে বসে, সেই চায়ের দোকানে গেলেও ঝামেলা।
তারই ছাত্র ছিল রশীদ। সেই রশীদ একদিন বিড়ি ফুকতে ফুকতে মাওলা সাহেবকে শুনিয়ে বলে, ‘এই মাওলা মাস্টের কিন্তু একটা সং। পোলাপাইনের পাশে বইসে সেগো লজ্জা দেয়ার চেষ্টা করে।’
আরে বেটা, লজ্জা দেওয়ার কি আছে! তোর বিড়ি খেতে ইচ্ছে হয়, খা না। কিন্তু এমন কথা মাওলা সাহেব বলতে পারেন না। একটা নেভি সিগারেট ধরিয়ে ধীরে ধীরে বাজার থেকে চলে আসতেন। বিকেল বেলায় কোথায় যাবেন? শেষ দিকে নতুন বানানো স্কুল বিল্ডিংয়ের ছাদে উঠে তাই একা একা বসে থাকতেন।
বাড়ি ফেরার তো উপায় নেই। ছেলেগুলো কেন যেন দুই চোখে দেখতে পারে না। ছোটটা দেখা হলেই বলে, ‘বাবা বিশটা টাকা দেও’।
আচ্ছা, টাকা কি কাছে থাকে? বেতন তুলে বাড়ি ফিরতে যেটুকু সময় লাগে, বেতনের টাকা তো এরপরই সালেহা বানুর হাতে চলে যায়। সারা মাস মাওলা সাহেবকে কড়ায়-গন্ডায় হিসেব দিয়ে পয়সা নিতে হয়। এর মধ্যে তিনি কি করে ছেলেদের টাকা দেবেন?
তাই ছেলের হাতে পড়ার চেয়ে স্কুলের ছাদে বসে থাকাটা অনেক ভালো। অবশ্য বাড়ি ফিরলে ছেলেদের হাতে পড়ার চেয়ে বড় ভয় ছিল সালেহা বানুর হাতে পড়া। এই ভদ্রমহিলা কেন যেন করিম মাওলাকে বিয়ের পরদিন থেকে জোক বলে মনে করেন।
না, মুখে কখনো মাওলা সাহেবকে ‘জোক’ বলে ডাকেননি। মুখে বলতে হয় না। দেখলেই এমন ভঙ্গি করেন সালেহা খাতুন যে, মাওলা সাহেবের নিজেরই নিজেকে জোক বলে মনে হয়।
এই অনুভূতিটার সঙ্গে মাওলা সাহেবের প্রথম পরিচয় বিয়ের পরদিনই। সালেহা খাতুন তখনও ঘোমটা খুলে লোকেদের সামনে পরিচিত হয়ে ওঠেননি। এর মধ্যেই মাওলা সাহেবকে ফিস ফিস করে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘তোমার মুখে এমন বিড়ির গন্ধ কেন?’
সেই থেকে এখনও পর্যন্ত প্রায় কোটি খানেক প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছেন মাওলা সাহেব। এর এক শ ভাগের এক ভাগ প্রশ্নেরও উত্তর জানলে মাওলা সাহেব বিসিএস পাস করে যেতেন বলে বিশ্বাস। এখনও চলছে সেই প্রশ্ন আর প্রশ্ন।
বাড়ি ফিরলেইÑপাজামায় দাগ কিসের? এতোন কই ছিলা? এ মাসে বেতন কম পাইলা কেন?; হাজারটা প্রশ্ন। এই যে মাওলা সাহেব উড়তে শিখেছেন, এদে গ্রাম জুড়ে তার একটু হলেও কদর বেড়েছে। লোকে এখন একটু পাত্তা দেয়। কিন্তু সালেহা খাতুন সেই আগের মতোই।
উড়তে শেখার আগে পরে, আরেক জন লোকের কাছে অবশ্য মাওলা সাহেব একইরকম আছেনÑকালীপদ হালদার। হাইস্কুলের অঙ্কের মাস্টার কালীপদ বাবু। এই দুনিয়ায় একমাত্র লোক যিনি উড়তে শেখার আগেও মাওলা সাহেবকে পাত্তা দিতেন।
এখনও দেন, তবে বাড়তি কোনো গুরুত্ব ওড়ার জন্য দেন না। কালীপদ বাবু বরং মাঝে মাঝে বলেন, ‘এই বয়সে এসব ওড়াউড়ি ভালো না, মাওলা। উড়লে উড়বে ছোট ছেলেপিলেরা। তুমি কেন উড়তে যাও। বুড়ো বয়সে উড়তে গিয়ে হাত-পা ভাঙলে বিপদ।’
মাওলা সাহেব এসব কথায় পাত্তা দেন না। উড়তে পারেন বলেই না আজকাল লোকে তার সঙ্গে ডেকে কথা বলে। এমনকি হেডমাস্টার সাহেব পর্যন্ত মাঝে মাঝে বাড়ি এসে দেখা করেন, ‘তুমি তো আমাদের গর্ব মাওলা। তোমাকে নিয়ে এখন পত্রপত্রিকায় লেখা হচ্ছে।’
হ্যা, পত্রিকায়, মানে স্থানীয় দৈনিক সর্বাঞ্চলে মাওলা সাহেবকে নিয়ে একা লেখা ছাপা হয়েছেÑউড়ন্ত মানব। পাশের গ্রামের বশির এই পত্রিকায় কাজ করে। সে একটু রঙ-টঙ চড়িয়ে লিখেছে, ‘মাওলা সাহেব ছোটবেলা থেকেই অত্যন্ত সাহসী মানুষ বলে পরিচিত। স্থানীয় মানুষের মঙ্গলের জন্য সর্বদাই তিনি ব্যতিব্যস্ত। সেই মাওলা সাহেব এখন উড়তে শিখে স্থানীয় লোকেদের প্রভূত উপকার করছেন...’।
এটা খানিকটা সত্যি। মাওলা সাহেব উড়তে শেখায় গ্রামের লোকেদের সত্যিই কিছু উপকার হয়েছে। অন্তত গাছ থেকে নারকেল পাড়া বা চালের ওপর থেকে কুমড়ো পেড়ে দেওয়ায় মাওলা সাহেবের জুড়ি নেই।
মাওলা সাহেব উড়তে পারায় সবচেয়ে উপকার হচ্ছে ছেলেপিলের। ইদানীং তারা মাওলা সাহেবের খুবই ন্যাওটা হয়ে গেছে। কারণ মাওলা সাহেব উড়ে যাওয়ার সময় ওদের গাছে বেধে যাওয়া ঘুড়িটা পেড়ে দেন, বরই-আম পেড়ে দেন।
মাওলা সাহেব এখনবাজারে গেলে লোকজন খাতির করে বসায়। দু একদিন পয়সা না দিয়েই চা-বিড়ি খেয়ে আসতে পারেন, অন্য কেউ দিয়ে দেয়। লোকেরা বাইরের মানুষের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়, ‘এই যে আমাগো উড়ালী মাওলা।’
মাওলা সাহেবের খ্যাতি একটু একটু করে শহরে পৌছে গেল। এক টেলিভিশন সাংবাদিক চলে এলেন ক্যামেরা নিয়ে। মাওলা সাহেব ঠিকই উড়লেন। কিন্তু বেয়াড়া ক্যামেরা সেদিন বিগড়ে গেল। তাই টেলিভিশনে দেখা গেল না উড়ালী মাওলাকে।
সবমিলিয়ে মাওলা সাহেবের এখন রমরমা সময়। পুরো গ্রামেরই আজকাল রমরমা সময় যাচ্ছে। সেটা মাওলা সাহেবের জন্য না। গ্রামে বিদ্যুত আসছে বলে। এবার ইউনিয়ন কাউন্সিল নির্বাচনে চেয়ারম্যান হয়েছে এই গ্রামের রশীদউদ্দি।
রশীদউদ্দি মাওলা সাহেবেরই ছাত্র ছিল। অত্যন্ত বাঁদর ও মূর্খ প্রকৃতির ছাত্র ছিল। কিন্তু চেয়ারম্যান হয়ে গেলে বাঁদররাও ভালো হয়ে যায়, মূর্খরাও জ্ঞানী হয়ে যায়। তাই রশীদউদ্দি এখন বিশিষ্ট মানুষ। সেই বিশিষ্ট মানুষ রশীদউদ্দির চেষ্টায় গ্রামে বিদ্যুত আসছে।
সে জন্য অবশ্য গ্রামের লোকেদের কিছু টাকা খসাতে হয়েছে। মাওলা সাহেবের বাড়িও লাইন নেওয়ার জন্য ৫ হাজার টাকা দেওয়া লেগেছে। তারপরও বিদ্যুত আসছে। গ্রামে খুটি বসানো শুরু হয়ে গেছে। আগামীকাল থেকে নাকি তারও টানা শুরু হবে।
মাওলা সাহেবেরও এই সুবাদে ব্যস্ততা বেড়ে গেছে। বিদ্যুতের লোকজনের খুব সাহায্য করছেন মাওলা সাহেব। এ খুটি থেকে ও খুটি উড়ে গিয়ে তার টানায় সাহায্য করছেন। কখনো আবার খুটির মাথায় সাদা সাদা সকেট উঠিয়ে দিচ্ছে।
মাঝে মাঝেই হুঙ্কার শোনা যাচ্ছে, ‘উড়ালী চাচা, এই খুটিতে ক্যাবেলটা একটু লাগায়ে দেন না।’
উড়ালী মাওলা মহা আনন্দে উড়ে উড়ে এইসব করে চলেছেন। জীবনে এই প্রথম নিজেকে বড় প্রয়োজনীয় মনে হচ্ছে।
দেখতে দেখতে গ্রামের সব বাড়িতে তার লেগে গেল। আগামী শুক্কুরবার বাদ জুম্মা রশীদউদ্দি চেয়ারম্যান সুইচ টিপে গ্রামে বিদুত উদ্বোধন করবে। সে নিয়েও বিরাট তোড়জোড়।
স্কুল মাঠে বিশাল প্যান্ডেল করা হয়েছে। মাওলা সাহেব উড়ে উড়ে নারকেলের পাতা, কুটো এনে দিচ্ছেন; লোকেদের বসার জন্য। বিকেল বেলায় শুরু হয়ে গেল অনুষ্ঠান। সারা গ্রাম ভেঙে পড়েছে বিদুত উদ্বোধন দেখার জন্য।
একটা বড় সুইচ টিপে দেবেন চেয়ারম্যান রশীদউদ্দি। সঙ্গে সঙ্গে আলো জ্বলে উঠবে, বেজে উঠবে মাইক। তাই হল রশীদউদ্দি সুইচ টিপলেন। আলো জ্বললো। কিন্তু ঝামেলা করল মাইক। একটা হিন্দী গানের এক লাইন বেজেই কো কো করে থেমে গেল।
এরপর মাইকে গান বাজাতে গেলেই ওই কো কো শব্দ। বড়ই হতাশ হলো লোকজন। তাই বলে অনুষ্ঠান তো থেমে থাকতে পারে না। বক্তুতা শুরু হল। উথালিপাথালি বক্তৃতা দিতে শুরু করলেন রশীদউদ্দি। হঠাৎ বক্তৃতার মাঝেই তার মনে পড়ে গেল মাওলা সাহেবের কথা, ‘আমাদের গ্রামের গর্ব, এই দুনিয়ার বিস্ময় মাওলা সাহেব সম্প্রতি আকাশে ওড়ার গৌরব অর্জন করেছেন...’
মাওলা সাহেবের বুকটা ফুলে গেল। গ্রামের মহিলাদের সঙ্গে সালেহা খাতুনও বসা আছেন। তিনি কি শুনছেন কথাগুলো? কে জানে! চেয়ারম্যান বলেই যাচ্ছেন, ‘আমি সরকারের কাছে সুপারিশ করব মাওলা সাহেবকে যেন একুশে পদক দেওয়া হয়...’।
কে যেন ‘হাতেক তালি’ বলে চিৎকার দিল। অমনি হাতে তালি শুরু হয়ে গেল। আবার মাইক কো কো শুরু করল। বড়ই বিরক্ত হচ্ছে চেয়ারম্যান রশীদউদ্দি। বিরক্তি থেকে বাচতেই কিনা প্রস্তাব করলেন, ‘এবার আমাদের একটু উড়ে দেখাবেন উড়ালী মাওলা সাহেব।’
মাওলা সাহেবকে কয়েকজন ধরে নিয়ে গেল স্কুলের ছাদে। কিন্তু মাওলা সাহেব আজ উড়তে চাচ্ছিলেন না। একটা ঝামেলা হয়ে গেছে। আজ অনুষ্ঠান উপলে বিকেল বেলায় পাজামা-পাঞ্জাবী পরে বেরিয়েছিলেন মাওলা সাহেব। যদি কেলেঙ্কারী হয়ে যায়?
লোকজন কথা শুনল না। মাওলা সাহেব দু হাত ছড়িয়ে বাতাসের জন্য এক লহমা অপো করলেন। তারপরও উড়াল দিলেন। ওপর থেকে সবাইকে কত্ত ছোট্ট দেখা যায়। তার স্ত্রী সালেহা খাতুন, হেডস্যার, রশীদউদ্দি; সব্বাইকে এখন খুব ছোট লাগছে।
মাওলা সাহেব নামার জন্য প্রস্তুতি নিলেন। তখনই কেলেঙ্কারিটা হয়ে গেল। পা জড়িয়ে গেল পাজামায়। পড়ে যাচ্ছেন মাওলা সাহেব। এখানে গাছও নেই যে আকড়ে ধরবেন। পড়তে পড়তে হঠাৎ হাতের কাছে পেলে সেই তার, আকড়ে ধরলেন মাওলা সাহেব।
গতকাল পর্যন্ত যে তার বরফ ঠান্ডা ছিল, তাই আজ কেমন হিংস্র হয়ে উঠেছে। সালেহা খাতুনের চেয়েও ভয়াবহ চেহারায় জ্বলে উঠল বিদ্যুতের তার।
নিচে ‘গেল গেল’ রব উঠল। রবটা কি শুনতে পেলেন মাওলা সাহেব? নইলে তার থেকে ছিটকে পড়ার সময় তার মুখে অমন হাসি থাকবে কেন?
হাসি হাসি মুখ নিয়ে মাটিতে পড়লেন মাওলা সাহেব। সারা শরীর পুড়ে গেছে, কিন্তু মুখে হাসি। মনে হয়, উড়তে গিয়ে বিদ্যুতে পুড়ে মরার চেয়ে আনন্দের আর কিছু হয় না।

সোশ্যাল নেটওয়ার্ক

Twitter Delicious Facebook Digg Stumbleupon Favorites